skip to Main Content

কভারস্টোরি I ফ্যাশনে সম্পর্ক

বাংলাদেশের লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বয়স দেখতে দেখতে ৪৫ বছর হলো। মানুষ হলে বলা যেত অস্তগামী যৌবন। চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই শিল্পখাত কেমন চলছে? কেমন আছেন সংশ্লিষ্ট কুশীলবেরা? কেমনই-বা সম্পর্ক এই শিল্পের উদ্যোক্তা আর কর্মীদের মধ্যে কিংবা তাদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন শেখ সাইফুর রহমান ও সারাহ্ দীনা

বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বর্তমানে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পটবদলটা স্পষ্ট। এটা হওয়ার ছিল কি না, তা নিয়ে গবেষণা হতেই পারে। এই ইন্ডাস্ট্রির শুরুটা স্বাধীনতার পরপরই। সদ্য স্বাধীন দেশে একটা ফ্যাশন হাউজ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন আশরাফুর রহমান ফারুক। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিপুণ ক্র্যাফটস। এর আগে যে এই ইন্ডাস্ট্রি ছিল না, তা নয়। তবে স্বাধীনতার পর নিপুণ দিয়ে নতুন দেশে নতুন একটা ইন্ডাস্ট্রির গোড়াপত্তন হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প- যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, তখনো ছিল স্বপ্নাতীত। এরপর হাউজের সংখ্যা বেড়েছে। আশির শুরুতে আড়ং এসে ইন্ডাস্ট্রিকে নতুন উচ্চতা দিয়েছে। ওই দশকেই হয়েছে টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির। সেই ধারায় একের পর এক হাউজ হয়েছে। ট্র্যাডিশনাল পোশাকসম্ভারে সাজানো হাউজের পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন ড্রেস নিয়েও বেশ কিছু হাউজ আত্মপ্রকাশ করে সফল হয়। ক্যাটস আই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর সিংহভাগই হয়েছে শখে। নব্বইয়ের মাঝামাঝি কে-ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, রঙ, অ্যান্ডেজ- কাফেলা হয়েছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। পরের দশকে যোগ হয়েছে আরও অনেক হাউজ। উল্লেখযোগ্য সাদাকালো, বিবিআনা, বাংলার মেলা। পরে এই ধারায় যোগ হয়েছে অনেক হাউজ। কিছু টিকে আছে সরবে, কিছু টিম টিম করে জ্বলছে নয়তো মৃত্যুবরণ করেছে। নতুন শতকের প্রথম দশক শেষ হতে না-হতেই ট্রেন্ড পাল্টাতে শুরু করে। তত দিনে এই ইন্ডাস্ট্রি একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। বলতে গেলে তৈরি এই মার্কেট ধরতে মাঠে নামেন তৈরি পোশাকশিল্পের কুশীলবেরা। যদিও এই ট্রেন্ড একেবারে নতুন, তা বলা যাবে না। কারণ, সেই আশির দশকের মাঝামাঝি গড়ে ওঠা পিয়ারসন্সকে পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। সে সময় সাড়াও জাগায়। তাদের পেছনে ছিল তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা। পরে সোল ডান্স, আর্টিস্টি, ইয়েলো, এক্সট্যাসিও এই ধারাকে বেগবান করে। তবে নতুন শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে লা রিভ এই ধারার নবীনতম সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে যোগ হয় সেইলর। সদ্য যোগ হয়েছে এমব্রেলা, ক্লাবহাউজ আর সারা। এই সংখ্যা দিনে দিনে আরও বাড়বে। কারণ, বাজার যথেষ্ট বড়। আর তাদের কোনো কিছুই করতে হচ্ছে না। তৈরি একটা প্ল্যাটফর্মকেই তারা ব্যবহার করার সুযোগ ও সুবিধা- দুটোই নিতে পারছে।
আমরা জানি, আশির গোড়ায় এসে শুরু হয় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প। সময়ধারায় এই শিল্প বিশ্বে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর থেকে আরও উন্নতি সম্ভব ছিল, কিন্তু তা হয়নি স্রেফ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কুশীলব এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতায়। অন্যদিকে শখের বশে শুরু হওয়া একটা ইন্ডাস্ট্রি এখনো সেই অর্থে পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারেনি। তৈরি হয়নি প্রকৃত এবং কার্যকর অবকাঠামো। এমনকি সরকারের সঙ্গে দেনদরবারের জন্য নেই কোনো প্রেশার গ্রুপ। ফলে রাষ্ট্রীয় অনেক কিছূ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশীয় এই শিল্পখাত। যার সম্ভাবনা প্রচুর এবং নানামাত্রিক। একসময় বুটিক কনসেপ্টে আত্মপ্রকাশ করলেও পরে সেটা মাস প্রডাকশন পর্যায়ে চলে যায়। ফলে সেই অর্থে বাংলাদেশে এখন আর কোনো বুটিক নেই।
ফ্যাশন হাউজের সংখ্যা ও টার্নওভারে এর কলেবর যথেষ্ট বড়। উপরন্তু এর রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখনো নেই সরকারিভাবে শিল্পখাতের স্বীকৃতি। এর কারণ উভয়মুখী।
তৈরি পোশাকশিল্প যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে, দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি তা পারেনি। ফলে এই শিল্পখাত থেকে নিয়মিত সুবিধা অর্থাৎ নানা ধরনের কর আদায় করলেও সরকারের কোনো কৃপাদৃষ্টি বাস্তবিকই নেই। এই ইন্ডাস্ট্রি রক্ষায় নেই কোনো আইন। ফলে বিদেশি পণ্য অবলীলায় ঢুকে যাচ্ছে সহজ শর্তের বৈধ পথে। এবং অবৈধ পথেও।
ইন্ডাস্ট্রি ইনসাইডার মো. রফিকুল ইসলাম মনে করেন, কিছু কিছু সুবিধা এই শিল্পখাতের উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন। সেটা এসএমইর মাধ্যমে। তবে ব্যাংক ঋণ পেতে এসএমই ফাউন্ডেশন ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই সেক্টর ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অংশ হলেও তার সুফল ভোগ করতে এখনো সক্ষম হচ্ছে না। এমনকি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্প খাত হিসেবে এই শিল্পের বর্তমানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩-৫। যা বলা যায় নগরায়ণ সম্প্রসারণের (৩-৫%) সমান। তবে তৈরি পোশাক খাত যে সুবিধা ভোগ করছে, সেটা পাচ্ছে না দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি। পক্ষান্তরে এখানে আবার তৈরি পোশাক খাত থেকে আসা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পুরোনো উদ্যোক্তাদের পার্থক্য স্পষ্ট। কারণ, তৈরি পোশাক খাতের সুবিধা (সরকারের প্রণোদনা, ডলারের পেমেন্ট, জিএসপি সুবিধা) সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা শ্রেণি ভোগ করতে পারছে। সেটা যেমন অবকাঠামোগত, তেমনি অর্থনৈতিকও। পাশাপাশি কাঁচামালের সুবিধা তো আছেই।
ফলে যারা দীর্ঘদিন এই সেক্টরে থেকে ইন্ডাস্ট্রিকে একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, তারা বহুমুখী চাপের মধ্যে পড়েছেন- বিদেশি পণ্য, সরকারের ঔদাসীন্য, তৈরি পোশাক খাতের সুবিধা নিয়ে বাজার দখল করা প্রতিষ্ঠান। এর ফলে সামগ্রিকভাবে হাউজগুলো প্রতিবছরই হারাচ্ছে মার্কেট শেয়ার।
অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রির দীর্ঘদিনের সারথি ডিজাইনার, গবেষক ও বিশ্লেষক চন্দ্র শেখর সাহা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য হাউজগুলোর অপেশাদার কর্মপ্রক্রিয়াকেই দায়ী করেছেন। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত নানা ক্ষেত্রের মধ্যে সম্পর্ক এসব কারণেই সুদৃঢ় হয়নি বলে তাঁর অভিমত। তিনি বলেন, প্রথমত সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ইন্ডাস্ট্রির জন্য সুবিধা আদায় এখনো দৃশ্যমানভাবে সম্ভব হয়নি। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায় বা মাঠপর্যায়ে যেসব উৎপাদক কাজ করেন, তারাও সঠিক সুফল পাচ্ছেন না তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মতো কোনো সংগঠন বা সংস্থা না থাকায়। ফলে তাদের প্রাপ্য আর দাবিদাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। অভিন্ন অভিমত মো. রফিকুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, অনেক সময় কাজের সঙ্গে পেমেন্টের সংগতিও থাকে না।
আবার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই দেওয়া-নেওয়ার প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের স্বার্থ সমুন্নত থাকা জরুরি বলে মনে করেন চন্দ্র শেখর সাহা। কিন্তু স্বীকার করেন, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা হয় না। এ জন্য তিনি এই সম্পর্ক উন্নয়নে উভয় পক্ষে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা আর যথাযথ পেশাদার ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কলেবর ও টার্নওভার
১৯৭৩ থেকে শুরু করে ২০১৮- এই ৪৫ বছরে ইন্ডাস্ট্রির কলেবর বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ফ্যাশন হাউজের সংখ্যা বর্তমানে অন্তত ৫ হাজার। এর মধ্যে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হাউজের সংখ্যা ১০০-এর মতো। ইন্ডাস্ট্রির টার্নওভার এখন প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এই ধারণা দিয়েছেন অঞ্জন’স-এর শীর্ষ নির্বাহী শাহীন আহম্মেদ। তিনি বলেন, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর আউটলেটের সংখ্যা বেড়েছে ৫ গুণ।
তবে আমাদের দেশে ফ্যাশন হাউজ শুরু করতে কোনো নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয় না। ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজন কেবল ট্রেড লাইসেন্সের। নিজেদের প্রয়োজনে কেবল লোগো রেজিস্ট্রেশন করান অনেকে। এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য কোনো কপিরাইট আইনও নেই।
ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আজহারুল হক আজাদের অভিমত, বর্তমানে এই শিল্পখাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার নিরিখে, কোনোভাবেই একে ছোট বলা যাবে না, বরং মাঝারি থেকে বড় আকারের শিল্প এখন এটি। এমনকি বার্ষিক টার্নওভারও দেশের অন্য অনেক শিল্পের থেকে কম নয়, বরং বেশিই।
ফলে এই শিল্পখাত প্রতিশ্রুতিশীল। সম্ভাবনায় পূর্ণ। সব দিক থেকেই। একে সঠিক অবকাঠামোয় দাঁড় করানোর পাশাপাশি প্রয়োজন পেশাদার ব্যবস্থাপনা, বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা এবং যুগোপযোগী ব্র্যান্ডিং। তবেই সম্ভব একে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, এই অভিমত একাধিক বিশেষজ্ঞের।
কর্মসংস্থান
লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ কর্মী এই সেক্টরে কাজ করছেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। এর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ অন্তত ৯০ শতাংশ। এমনকি, যারা আগে ঘরের কাজ সামলে অলস সময় কাটাতেন, তাদেরও অনেকে এখন কাজ করছেন খন্ডকালীন কর্মী হিসেবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের একটি বিশাল অংশ এখন এই শিল্পখাতের সঙ্গে জড়িত। বলা যায়, এটি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিশ্চিত করেছে নারীর ক্ষমতায়ন। উপরন্তু নতুন উদ্যোক্তা তৈরিও করেছে।
ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহিন খান বলেন, সারা বছর সব প্রতিষ্ঠানই স্থায়ী কর্মী বাহিনী নিয়ে কাজ করে। এর সংখ্যা অনেক। অন্যদিকে, উৎসবের সময় অনেক খন্ডকালীন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর বাইরে রয়েছে, উৎপাদক, যারা কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী বা অস্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মী নন। বরং তারা নিজেরাও উদ্যোক্তা। স্বাধীনভাবে কাজ করেন। তারা ফ্যাশন হাউজগুলোতে পণ্য সরবরাহ করে থাকেন। এদের সংখ্যাও কম নয়। উপরন্তু এই শিল্পে আরও জড়িত বিপুলসংখ্যক কারুশিল্পী, বয়নশিল্পী, সূচিশিল্পী, মৃৎশিল্পী, দারুশিল্পী, রঞ্জকশিল্পীসহ নানা মাধ্যমের কারুশিল্পী।
শ্রমস্বার্থ
দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী কাজ করলেও এখনো কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি বলে তাদের বেতন-ভাতা, ছুটিছাটা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তা অনুসরণের কোনো উপায় নেই। বরং শিল্পসংশ্লিষ্টরা ও উদ্যোক্তারা বলছেন, সমসময়ের শ্রমের বাজারমূল্যের ওপর নির্ভর করে মজুরি ও বেতন। এমনকি প্রাথমিক ধাপে কর্মরতদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। ফলে যেকোনো সময় চাকরি হারানোর ভয়ও থাকে। বিষয়টি নিয়ে আজহারুল হক আজাদ জানালেন, এ শিল্পে কর্মী ও মালিকপক্ষ অথবা উদ্যোক্তাদের জন্য তেমন কোনো লিখিত নীতিমালা নেই। কর্মীদের শ্রমমূল্য, বেতনকাঠামো, ছুটি ও অবসর ভাতা ইত্যাদির জন্য কোনো নীতিমালা না থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে নির্ভর করতে হয় চলতি শ্রমবাজারের ওপর। দেশীয় ফ্যাশনের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতাও যথেষ্ট। তা ছাড়া দক্ষ কর্মীর সংখ্যা আশাব্যঞ্জক হারে বাড়েনি। এ জন্য দক্ষ কর্মী পেতে শ্রমমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিযোগিতা রয়েছে।
সেইলরের প্রধান পরিচলন কর্মকর্তা রেজাউল কবির অবশ্য বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি এবং লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি উভয় খাতেই রয়েছে আমাদের উপস্থিতি। ফলে উভয় ক্ষেত্রে অভিন্ন নিয়ম অর্থাৎ রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির নিয়মই অনুসরণ করা হয়ে থাকে। এতে করে একধরনের বিভেদ থেকে যাচ্ছে কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে, এটা স্বীকার করেন এই শিল্প খাতের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও কর্মী উভয়েই।
দক্ষ কর্মীর অভাব
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দক্ষ কর্মী সব থেকে বেশি দরকার ডিজাইনিংয়ে। দেশে ডিজাইন স্কুল থাকলেও ইন্ডাস্ট্রির উপযোগী ডিজাইনার সেখান থেকে আসছে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি স্কুলের কারিকুলামের দুর্বলতার পাশাপাশি নেই দক্ষ শিক্ষক। অন্যদিকে স্থানীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিবান্ধব কোর্স কারিকুলাম তৈরির প্রতিও মনোযোগী নয় স্কুলগুলো।
অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে আসা ডিজাইনারদের ব্যাপারে দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির একধরনের ঔদাসীন্য রয়েছে, যা অস্বীকার করা যাবে না। আবার এই খাতে বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য নয় বলে তারা তৈরি পোশাকশিল্পে চলে যাচ্ছে। সেখানে ডিজাইনার হিসেবে নয়, তাদের কাজ করতে হচ্ছে ডেভেলপার হিসেবে। তবু আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যকেই গুরুত্ব দিয়ে তারা সেদিকেই ঝুঁকছে।
ছুটিছাটা
যেকোনো ক্ষেত্রেই কর্মীদের ছুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শাহীন আহম্মেদ জানান, সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয় কর্মীদের, তা ছাড়া রয়েছে উৎসবের জন্য ছুটি; দুই ঈদে সবাই সাত দিন করে ছুটি পেয়ে থাকেন। তবে গর্ভকালীন ছুটিবিষয়ক কোনো নীতিমালা তাদের নেই।
রেডিমেড গার্মেন্টস থেকে লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দেওয়া একটি ব্র্যান্ডের একজন ডিজাইনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা সুযোগ-সুবিধা রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির মতোই ভোগ করেন। সাপ্তাহিক এবং উৎসব ছুটি পাচ্ছেন নিয়মিত। আর গর্ভকালীন ছুটি সাধারণত চার মাস দেওয়া হয়ে থাকে। তবে কোনো ওভারটাইম বা অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য অর্থ দেওয়া হয় না।
দীর্ঘদিন লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত একজন ডিজাইনার এ নিয়ে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন, বেতন কোনো নীতিমালা অনুযায়ী দেওয়া হয় না। সাপ্তাহিক আর উৎসবের ছুটি আছে, কিন্তু কোনো ওভারটাইম নেই। নকশা বিভাগের চাকরি বেশির ভাগই দীর্ঘকালীন নয়, তাই গর্ভকালীন ছুটি নিয়ে তেমন কোনো টানাপোড়েন শুরু হয়নি। কাজ করা সম্ভব না হলে জানিয়ে দেন কর্মী নিজেই।
কেমন আছেন শ্রমিকেরা
কেমন আছেন শ্রমিকেরা, সে প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা ও ডিজাইনার মাইনউদ্দিন ফুয়াদ জানান, বিধিবিধান না থাকার কারণে শ্রমিকদের সুবিধাদি বিষয়ে কোনো নিয়ম অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। তবে রেডিমেড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি-ব্যাকড হাউজগুলোর সঙ্গে বেতন-ভাতা ও সুবিধাদির পার্থক্য চোখে পড়ার মতোই।
শিল্পবিষয়ক নীতিমালা
উদ্যোক্তাদের কোনো সংগঠন আগে ছিল না। বর্তমানে হয়েছে: ফ্যাশন এন্ট্রাপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। কিন্তু কোনো লিখিত নীতিমালা সংগঠনটি এখনো তৈরি করেনি। সাংগঠনিকভাবে কিছু নিয়ম তারা অবশ্য মেনে চলছেন। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো: কর্মীদের সুনির্দিষ্ট বেতন (যদিও সেটা হাউজগুলো নিজেদের মতোই নির্ধারণ করে থাকে), বছরে দুটি উৎসব বোনাস, সাপ্তাহিক ও বার্ষিক ছুটি এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি।
যদিও কর্মীদের কোনো সংগঠন নেই; তবে তা করার ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞাও নেই। অন্যদিকে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডিজাইনারদের মূল সংগঠন হলো ডিজাইন কাউন্সিল। কিন্তু আমাদের দেশে ডিজাইন কাউন্সিল ঠিক তেমন নয়। এটা মূলত ডিজাইনার-কাম-মালিকদের সংগঠন। ফলে বাস্তবতা হলো কর্মী ডিজাইনারদের স্বার্থ কোনোভাবেই রক্ষা করা এই সংগঠনের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া আর কোনো সংগঠন না থাকায় কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা সরাসরি উদ্যোক্তা অথবা উদ্যোক্তা-প্রতিনিধিকেই জানাতে হয়।
প্রতিবন্ধকতা
লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয়। বলা যেতে পারে, এই শিল্পখাতের বিকাশ ও উন্নয়নে এগুলো অন্তরায় হচ্ছে:
 সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো না থাকা; তাতে যথাযথ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কর্মীরা
 দক্ষ শ্রমিকদের কাছে উদ্যোক্তারা হয়ে পড়ছেন জিম্মি
 শখের বশে পরিকল্পনাহীনভাবে অলস টাকায় ব্যবসা শুরু করা উদ্যোক্তারা নষ্ট করছেন কর্মপরিবেশ
 সরকারি ঔদাসীন্য, অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া, করের চাপ, দোকান ভাড়ায় কোনো নিয়মনীতি না থাকা শিল্পের প্রসারে অন্তরায় হচ্ছে। তাতে করে উদ্যোক্তারা ক্রমেই পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন
 অবৈধ পথে আসা বিদেশি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে
 সহজ শর্তে ঋণের অভাবও শিল্পে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে
 মিলের কাপড়ের আগ্রাসনে স্থানীয় বয়নশিল্পও হুমকির মুখে। উপরন্তু ভালো মানের কাপড়ও তৈরি হচ্ছে না। ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক তাঁত, যা তৈরি করছে সংকট। এই সংকট কেবল বয়নশিল্পীদের নয়, অন্য হস্তশিল্পীদেরও। পক্ষান্তরে ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত প্রচারণা কিংবা তার উদ্যোগের অভাবও উল্লেখের দাবি রাখে
 প্রযুক্তিগত দিকে অগ্রসরতা কম
 পেশাদার অবকাঠামো তৈরিতে উদ্যোক্তাদের অনীহা
 সংগঠনগুলোর যূথবদ্ধ হয়ে কাজের প্রতি অনীহা। প্রকট সমন্বয়হীনতা
 তথ্য প্রদানে উদ্যোক্তাদের অনীহা থাকায় কোনো জরিপ নেই। ফলে সরকারের পক্ষে এর পরিসীমা সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব হয় না
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন অ্যান্ড লেবার স্টাডিজ বিভাগের কোর্স কো-অর্ডিনেটর ও শিক্ষক প্রফেসর ড. গোলাম রাব্বানীর বক্তব্যে রয়েছে লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির উন্নতির পরামর্শ। তিনি মনে করেন, এই শিল্পসংশ্লিষ্ট সবার অধিকার নিয়ে ভাবার এবং তাদের সবার কল্যাণের জন্য লিখিত নিয়মাবলি তৈরি করার উপযুক্ত সময় এখন। এ ক্ষেত্রে শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ভূমিকা রাখতে পারেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমেরও রয়েছে এই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে ব্যাখ্যা। তিনি মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রির কাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে। লিখিত নিয়মাবলি তৈরির ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন নিয়ে কাজের অবকাশ থেকে যাচ্ছে। একে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখার বিকল্প নেই। এ জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করে অগ্রসর হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন ও কল্যাণে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট তথ্যরাশি লিখিত আকারে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, কাঠামোগত উন্নয়নে সাহায্য নিতে হবে শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের। শ্রম আইন, কর্মপরিবেশ, পরিবেশদূষণ ও শিশুশ্রমের দিকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে দেশের বাইরেও বাজার তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন ড. গোলাম মোয়াজ্জেম।
শেষ কথা
উদ্যোক্তারা চান সবার আগে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি। সে ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের মনোভাব বদলের প্রয়োজন। কারণ, এটা কুটির শিল্প যেমন নয়, তেমনি নয় তৈরি পোশাকশিল্পও। এমনকি ঘরোয়া ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির আকারও ছোট নয়। এর ব্যাপ্তি উল্লেখযোগ্য। দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমনকি পৃথিবীর অন্য সব দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এর দৃশ্যমান পার্থক্যও রয়েছে। যেটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তা ছাড়া, শিল্পের শুরু আবেগ থেকে হলেও বর্তমানে গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরি হয়েছে। ফলে বড় বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন অনেকেই। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি শিল্পের স্বীকৃতি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদেরও পরিস্থিতির প্রয়োজনে বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সংগঠিত হওয়া আবশ্যক। পক্ষান্তরে নিয়মাবলি তৈরিতে সরকারের যথাযথ সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই সম্ভব এই শিল্পের বিকাশ, উদ্বর্তন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

মডেল: অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: টুয়েলভ
ছবি: রিয়াদ আশরাফ, সৈয়দ অয়ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top