skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I ন্যাচারাল ফাইবার

প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর দিকে ঝুঁকছে পৃথিবী। শরীর ও পরিবেশ বাঁচানোর জন্য। বাংলাদেশও হতে পারে এর বৈচিত্র্যপূর্ণ উৎস

কাপড়ের মূল উপাদান ফাইবার বা তন্তু। স্পিনিংয়ের পর এতেই তৈরি হয় ইয়ার্ন বা সুতা। সুতা থেকে বয়নশৈলীর মাধ্যমে তৈরি হয় কাপড়। ফাইবার প্রধানত দুই ধরনের- ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক এবং আর্টিফিশিয়াল বা কৃত্রিম। শেষেরটাকে আবার ম্যানুফ্যাকচারড ফাইবারও বলে। ফলে সুতা হয় দুই ধরনের। ফ্যাব্রিকসও। তবে বর্তমানে কৃত্রিম সুতায় কাপড় তৈরির মহাযজ্ঞে দূষিত হয়ে পড়ছে বিশ্বপরিবেশ। সিনথেটিক ফাইবার বা ফ্যাব্রিকের ধ্বংসাবশেষ সহজে পচে না। উপরন্তু এটি তৈরি করতে গিয়ে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। দূষণ ও স্বাস্থ্যহানি একই সঙ্গে ঘটছে।
অন্যদিকে, ন্যাচারাল ফাইবার সহজে পচনশীল। ফলে এটা পরিবেশবান্ধব ও শরীরসম্মতও বটে। যেকোনো অবস্থায় ন্যাচারাল ফাইবারই সবচেয়ে আরামদায়ক। তবে এটি অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে শিল্পদূষণে সরাসরি প্রভাবিত পরিবেশে উৎপাদন ব্যাহত হবার কারণে।
ন্যাচারাল ফাইবার প্রধানত চার শ্রেণির- সেলুলোজ, রাবার, মিনারেল ও প্রোটিন। সেলুলোজ ফাইবারের মধ্যে রয়েছে সিড হেয়ার, কটন, কেপক। এই শ্রেণিবিভাগে অন্যগুলো হচ্ছে লিনেন, রেমি, পাট, হেম্প, বাস্ট, কেনাফ, কয়্যার, সিস্যাল, পিন, সয়াবিন, কর্ন ইত্যাদি।
সেলুলোজ ফাইবার মূলত গাছের আঁশজাতীয়, যা কোনো ছোট বা বড় গাছের বাহ্যিক অংশ থেকে সংগৃহীত হয়। শ্রেণিবিভাগে এরপরই প্রোটিন ফাইবারের স্থান, যা পোকামাকড় ও জীবজন্তুর শারীরবৃত্তীয়। অর্থাৎ শরীরের অংশ থেকে সংগৃহীত হয়। প্রোটিন ফাইবারের শ্রেণিবিভাগে রয়েছে অ্যানিমেল হেয়ার, উল, ক্যাশমেয়ার, ক্যামেল, মোহেয়ার, আলপাকা, লামা, হুয়ারিজু, ভিকুনা, গুয়ানাকো, চিয়েনগোরা (কুকুরের লোম), অ্যাঙ্গোরা (খরগোশ), ইয়াক, স্পাইডার সিল্ক ও সিল্ক।
ন্যাচারাল সেলুলোজিক ফাইবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে কটন বা সুতি, লিনেন ও পাট। তারপর রয়েছে রেমি। এগুলোর সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, জুটের ভিসকস ফাইবার আবিষ্কৃত হয়েছে আমাদের দেশে। এর মধ্য দিয়ে ন্যাচারাল ফাইবারের আরেকটি ধারা যোগ হয়েছে বিশ্বব্যাপী। ফলে সম্ভব হবে আরও বহুগুণ বেশি পাটপণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ন্যাচারাল বাস্ট ফাইবার
আমাদের কৃষি অর্থনীতির জন্য দারুণ সুখবর বয়ে আনছে ন্যাচারাল ফাইবার। কৃষির উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে আবিষ্কৃত হচ্ছে একের পর এক ন্যাচারাল ফাইবার। এমন অনেক কিছুই আমাদের চারপাশে রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না; অথচ সেসব থেকে কত চমৎকার উপকরণ বের হতে পারে। যেমন ধইঞ্চা গাছ। পাটের বিকল্প হিসেবে ধইঞ্চা চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষক এবং এ গাছ থেকে ন্যাচারাল ফাইবারও তৈরি হচ্ছে।
ফলে ধইঞ্চা শব্দটি অবজ্ঞাসূচক থাকছে না। কারণ, এই উদ্ভিদ থেকে জ্বালানি, সবুজ সারের পর এখন উৎপাদিত হচ্ছে ন্যাচারাল ফাইবার। আবার আফ্রিকান ধইঞ্চা গাছ কীটনাশক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ ন্যাচারাল ফাইবার হিসেবে সারা বিশ্বে নতুনভাবে পরিচিতি লাভের দ্বারপ্রান্তে। এর কাছাকাছি ন্যাচারাল ফাইবার হিসেবে সম্ভাবনা জাগাচ্ছে ধইঞ্চা গাছের ফাইবার। পাটগাছ যেভাবে জাগ দিয়ে আঁশ বের করা হয়, ধইঞ্চা আঁশও সেভাবে বের করা হয়। পরিমাণে পাটের মতো না হলেও এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেবার মতো নয়। ধইঞ্চা গাছের ন্যাচারাল ফাইবারের রঙ হচ্ছে রুপালি। ন্যাচারাল বাস্ট ফাইবারের মধ্যে পাটের মানসম্পন্ন আঁশের মতো ধইঞ্চার আঁশও মানসম্পন্ন করা যাবে, যদি যথাযথ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদি তা হয়, বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত হবে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ধইঞ্চা ফাইবার কিছু অংশে পাটের তুলনায় ভালো। যেমন- ফাইবারের দৈর্ঘ্য, আণবিক বিন্যাস, দৃঢ়তা। স্থায়িত্ব, ঘর্ষণ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ময়লা রোধের ক্ষমতা, পরিচ্ছন্নতা। তবে পাটের সহায়ক হিসেবে ধইঞ্চা ব্যবহার করার সুযোগ আছে। পাটের জিন গবেষণা ও উন্নয়নে যেমন বিজ্ঞানীরা সাফল্য এনেছেন, তেমনি ধইঞ্চার জিন নিয়ে গবেষণা এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বৈপ্লবিক কিছু ঘটানো সম্ভব।
আভিজাত্যের লিনেন
যখন সুতার ব্যবহার শুরু হয়নি, তখন থেকে লিনেন ন্যাচারাল ফাইবার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এ জন্য বলা হয়, লিনেন পৃথিবীর প্রথম বোনা কাপড়। মূলত ফ্ল্যাক্স গাছের আঁশ থেকে লিনেন ফাইবার সংগৃহীত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে মিসরের সমাধিস্থলের ভেতরে বোনা লিনেনের অস্তিত্ব মিলেছে। শুষ্ক ও গরম আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি আরামদায়ক লিনেন। অভিজাতও বটে। এই ন্যাচারাল ফাইবার বেশির ভাগ উৎপন্ন হয় পোল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, চীন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মিসরে। ‘র’ লিনেন ক্রিম কালারের হয়ে থাকে। তবে ওয়াশ এবং ডাই করে রঙ বদলে ফেলা হয়। লিনেন ফাইবারের দৈর্ঘ্য ৫ থেকে ২০ ইঞ্চি। অন্যদিকে কটন ফাইবারের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য দেড় থেকে আড়াই ইঞ্চি হয়। লিনেন কটনের চেয়ে ভারী আর শক্ত। তবে শুকনো থেকে ভেজা অবস্থায় এটি ২০ ভাগ বেশি শক্তিশালী। লিনেন ফ্যাব্রিকের বিশেষত্ব হলো এর ‘ক্রিজ’ ও ‘রিংকল’। শরীরে ঘাম শুষে নিতে পারে সুতির চেয়ে বেশি। আবার শুকিয়েও যায় খুব তাড়াতাড়ি। এ জন্য বিশ্বজুড়ে একে বলা হয় এয়ারকন্ডিশন্ড ফ্যাব্রিক। বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউজগুলোর মধ্যে শতাব্দীই প্রথম লিনেন দিয়ে পোশাক বানাতে শুরু করে, ২০০৩ সাল থেকে।
আনারস ও কলাগাছের ফাইবার
বাংলাদেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ন্যাচারাল ফাইবার প্রজেক্ট দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। সরকারি ও বেসরকারি এনজিও প্রতিষ্ঠান এ লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ব্যুরো বাংলাদেশ যৌথভাবে কর্মশালার আয়োজন করেছিল নরসিংদীর দোঘরিয়ায়। প্রতিপাদ্য ছিল ন্যাচারাল ফাইবারের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে এর পণ্য বাজারজাতকরণ। উদ্দেশ্য, মূলত মহিলাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটানো। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুই সহস্রাধিক নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা হয়েছে, যারা কলাগাছের ছাল ও আনারসের পাতা থেকে ন্যাচারাল ফাইবার তৈরি করবে এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে হ্যান্ডিক্রাফটস ও টেক্সটাইলে আসবে নতুন মাত্রা। পরিধেয় বস্ত্রের সঙ্গে এই ন্যাচারাল ফাইবারের সংযোগ এবং অ্যাকসেসরিজ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে এর ব্যবহার ফ্যাশনে আনবে নতুনত্ব। ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট কথাটি হয়ে উঠবে অর্থপূর্ণ।
আনারস ও কলাগাছের ফাইবার সংগ্রহ এবং বাজারজাতকরণের সব পর্ব স্থানীয়ভাবেই হচ্ছে। যেমন দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে এর জন্য মেশিনও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। দেশে এর ব্যবহার ও চাহিদা কম হলেও বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে লাভজনকভাবে। যেমন এক কেজি আনারসের পাতা থেকে ৬০ সেমি সুতা তৈরি হচ্ছে। এই সুতা বিভিন্ন দেশে লাক্সারি ফ্যাশনওয়্যারে ব্যবহৃত হচ্ছে। আনারসের সুতা এত দামি হওয়ার কারণ, এটি লিনেনের মতোই সুন্দর এবং এর প্রাকৃতিক ঔজ্জ্বল্য। ওজনে হালকা, অন্যান্য ফাইবারের সঙ্গে সহজে মেশানো যায়। এর কাপড় বেশ নরম, সিল্কের থেকে অনেক ভালো টেক্সার এবং সহজে ধোয়া যায়। ফলে ড্রাই ওয়াশের প্রয়োজন পড়ে না। টাঙ্গাইলের মধুপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এক হেক্টর জমিতে ৮০০ কেজি ফাইবার হিসেবে বছরে ১৬ হাজার মেট্রিক টন আনারসের ফাইবার তৈরি হতে পারে, যদি সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সম্ভাবনা অপরিমেয়
আমাদের দেশে কলাগাছ, ধইঞ্চা ইত্যাদির কদর নেই। অথচ বিদেশে এগুলোর ফাইবারে তৈরি হচ্ছে ‘গ্রিন হ্যান্ডিক্রাফটস’। আনারসের বেলাতেও তাই; বছরে আনারসের পাতার অপচয় হচ্ছে ব্যাপক, অজ্ঞতার কারণে। অথচ সারা দেশে এসব সম্ভাবনাময় খাতকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠতে পারে ছোট ছোট ট্র্যাডিশনাল ইন্ডাস্ট্রি। স্বাবলম্বী হতে পারে পিছিয়ে পড়া মানুষ ও নৃগোষ্ঠী। আমাদের ন্যাচারাল ফাইবার দেশীয় তুলা আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে, যা পুনরুদ্ধারের তাগিদ কোথাও নেই। এরপর পাটও হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু তা ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। আরও আছে বাঁশ, বেতের ফাইবার। এসবেরও সম্ভাবনা বিপুল।
বিশ্বজুড়ে আর্টিফিশিয়াল ফাইবারের ভয়ংকর ক্ষতির ব্যাপারে সবাই সচেতন হচ্ছে। কেননা, এটা শরীর ও পরিবেশ- দুটোর জন্যই বিপজ্জনক। সেদিক থেকে ন্যাচারাল ফাইবার বা প্রাকৃতিক তন্তুর বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে ফিলিপাইন। আনারস পাতার ফাইবারের নাম সেখানে ‘পিনা ফ্যাব্রিকস’; এটি পেয়েছে স্পেশাল ফ্যাশন প্রডাক্টের স্বীকৃতি। শুধু তা-ই নয়, ‘গ্রিন হ্যান্ডিক্রাফট’ লেবেলে সে দেশের পণ্য বিশ্বব্যাপী বাজারজাত হচ্ছে। এতে দেশটি যেমন লাভবান হচ্ছে, তেমনি সেখানকার পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে।
ন্যাচারাল ফাইবার নিয়ে আজ পর্যন্ত যত কাজ, সব ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু হয়েছে। ন্যাচারাল ফাইবার যদি সরাসরি উৎপাদন সম্ভব না হয়, তবে এর কাঁচামালও অনেক লাভজনক। কারণ, এটি রপ্তানিযোগ্য। পাটের সুতায় এ দেশে কৃত্রিম আঁশের বিকল্প হিসেবে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি বিদেশের বিখ্যাত সব গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের পাট দিয়ে তৈরি করছে গাড়ির অভ্যন্তর। অধিকন্তু প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্য ব্যবহারের সুখ দুনিয়াতে খুব কমই আছে।

 এস.এম. মাঈন উদ্দিন ফুয়াদ
মেকওভার: পারসোনা

পাটের শাড়ি : মডেল: প্রিয়াম : ওয়্যারড্রোব: তিথি

বাঁশের শাড়ি : মডেল: চাঁদনী : ওয়্যারড্রোব: ক্যানভাস

আনারসের স্কার্ফ : মডেল: স্পৃহা : ওয়্যারড্রোব: প্রবর্তনা

সিল্কের শাড়ি : মডেল: সূর্য : ওয়্যারড্রোব: মাধুরি সঞ্চিতা স্মৃতি

লিনেন পাঞ্জাবি : মডেল: নাহিদ : ওয়্যারড্রোব: শতাব্দী

ছবি: লেখক, সৈয়দ অয়ন ও ফারাবী তমাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top