skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I রাজশাহী সিল্ক

সিল্ক আভিজাত্যের চিহ্নবাহী। বরেন্দ্রভূমির রেশম একসময় বিশ্ববিখ্যাত ছিল। চাহিদা ছিল ইউরোপের অভিজাত মহলে। আজ আর সেদিন নেই। অতীত ছুঁয়ে বিদ্যমানের বর্ণনা দিয়েছেন রেশমের শহর রাজশাহী থেকে বুলবুল হাবিব

একসময় সিল্কের তৈরি কাপড়ের স্বর্ণযুগ ছিল। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই তখন লাভবান হতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় কর্তাব্যক্তিদের অদূরদর্শিতা আর গাফিলতির কারণে আজ তা নেমেছে শূন্যের কোঠায়। যে রেশমশিল্পকে কেন্দ্র করে রাজশাহী অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, তারা আজ বেকার হয়ে কিংবা অন্য কোনো পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। তারপরও অল্পসংখ্যক মানুষ যুক্ত আছেন এই শিল্পের সঙ্গে; রেশমের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন নিরন্তর।
রাজশাহীতে হ্যান্ডলুম ও পাওয়ার লুমের শব্দে মুখর থাকত দিনরাত। অথচ এখন সেখানে নীরবতা। মাঝে মাঝে দূর থেকে দু-একটি কারখানায় মেশিন চলার শব্দ শোনা যায়। সেখানে কাজ করেন হাতে গোনা কিছু বয়নশিল্পী। তারা মেধা ও শ্রমে বুনে যাচ্ছেন রেশম বস্ত্র। এসব কাপড় দিয়েই তৈরি হচ্ছে শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট ও সালোয়ার-কামিজ।

রেশমের উৎপাদন ও বিপণন
রেশমের সুতার জন্য পলু পোকা উৎপাদন করতে হয়। তারপর তাদের তুঁত পাতা খাইয়ে বড় করা হয়। ফলে তুঁত চাষও করতে হয়। পলু পোকা থেকেই রেশমের গুটি পাওয়া যায়। রেশমগুটি থেকেই পাওয়া যায় কাক্সিক্ষত সুতা। কয়েকটি ধাপে একে ব্যবহারোপযোগী করতে হয়। এই সুতা থেকে তৈরি করা হয় থান কাপড়। থান কাপড়কে গরম ভাপে দিয়ে বিভিন্ন রঙে নিয়ে আসতে হয়। তারপর রোদে শুকিয়ে ব্যবহারোপযোগী করতে হয়। সেখানেই শেষ নয়। এই থান কাপড়ের উপর এরপর করতে হয় নানা ধরনের নকশা। সেগুলোর মধ্যে আছে ব্লক প্রিন্ট, বাটিক প্রিন্ট, সফট প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, অ্যাপ্লিকে, এম্ব্রয়ডারি, হ্যান্ডপেইন্ট।
একসময় শুধু নগরীর সপুরায় ৫০ থেকে ৬০টি কারখানায় সুতা থেকে থান কাপড় বোনা, ডায়িং, পেইন্টিংসহ নানা কাজ হতো। অথচ বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৮-১০টি। আর এসব কারখানার বেশির ভাগ সুতাই আমদানি করা হয় চীন থেকে। যদিও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের তথ্যমতে, বিসিক এলাকায় ৬০টির মতো কারখানা রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ।
৮-১০টি কারখানা উৎপাদনে যুক্ত থাকলেও বাজারজাতকরণে রয়েছে ৭টি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর শোরুমে কাপড় এবং এতে তৈরি বিভিন্ন পোশাক বিক্রি করা হয়। বর্তমানে বিসিক এলাকায় সিল্ক পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সপুরা সিল্ক, ঊষা সিল্ক, মহুয়া সিল্ক, নিসা সিল্ক, রাজশাহী সিল্ক, রাজশাহী সিল্ক ফ্যাশন হাউজ ও ফৌজদার সিল্ক ফ্যাশন। এগুলোর মধ্যে সপুরা, ঊষা ও রাজশাহী সিল্ক ফ্যাশন সুতা থেকে থান বোনার পাশাপাশি শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও শার্ট তৈরি করে। এগুলোর মধ্যে সপুরা সিল্ক খুবই অল্প পরিমাণে সুতা তৈরি করে থাকে। বাকিগুলো চীন থেকে সুতা আমদানি করে।
পণ্যের দাম
নকশাভেদে এসব শোরুমে বিভিন্ন দামের সিল্কের শাড়ি পাওয়া যায়। যেমন, সিল্কের তৈরি শাড়ি পাওয়া যায় ১৫০০ থেকে ১৫০০০ টাকায়। পাঞ্জাবি ২০০০ থেকে ৫০০০ টাকা, থ্রি-পিস ৩০০০ থেকে ১০০০০ টাকা, শার্ট ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা, টাই ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
সিল্কের কাপড়ের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সুতার দাম বেশি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছে। অনেকে ব্যবসা ছোট করেছেন। আবার কারখানা বন্ধ করে শুধু শোরুম খুলে বসেছেন কেউ কেউ।
এ ছাড়া রাজশাহীতে সুতা উৎপাদন পর্যাপ্ত না থাকায় লোকসান হচ্ছে। একসময় সেখানে প্রচুর সুতা উৎপাদিত হলেও এখন তা এসে ঠেকেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। সরকারিভাবে যে পরিমাণ রেশম সুতা উৎপাদন করা হয়, তা দিয়ে বছরের দুই মাসেরও চাহিদা মেটে না- এ কথা ব্যবসায়ীরাই বলছেন। তাই বাধ্য হয়েই চীন থেকে সুতা আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া প্রযুক্তির উৎকর্ষ না ঘটায় এবং প্রাকৃতিক কারণে রেশমগুটি ছোট হওয়ায় ভালো সুতা উৎপাদিত হচ্ছে না। যা হচ্ছে, তার গুণগত মানও বেশ খারাপ।
বাংলাদেশ রেশমশিল্প মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি আব্দুল জলিল সরকার জানান, সুতার মূল্যবৃদ্ধিই বলতে গেলে রেশমশিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে; স্রেফ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেই কিছু মানুষ এখনো এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। ৫ মাস আগেও আমদানি করা সুতার মূল্য ছিল পাউন্ডপ্রতি ৫৫০০ টাকা। ট্যাক্স বাড়ানোর কারণে সুতার মূল্য বেড়ে হয়েছে ৭৫০০ টাকা।
তিনি জানান, রেশমশিল্পের নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বিভিন্ন কারখানায়। কোনো কারখানায় হয়তোবা স্পিনিং হয়, কোনোটায় ডায়িং ও পেইন্টিং, কোনোটিতে হাতের কাজ হয়। কিন্তু সুতার দাম বাড়ায় অনেক কারখানাতেই কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
সুতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমাদের সব পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে, বললেন ঊষা সিল্কের ডিজিএম নূর আহমেদ মাহবুব, না হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দুই মাস আগেও যে শাড়ির দাম ছিল ১৬০০ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২০০ টাকা। সুতার দাম কমানো গেলে শাড়ি অনেক কম মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব।
রাজশাহী সিল্ক ফ্যাশনের ম্যানেজার খুরশিদা খাতুন খুশি মনে করেন, সুতার দাম কমিয়ে আনতে পারলে আমাদের কারখানা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের চিত্র
রেশমশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য একসময় গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড। এ প্রতিষ্ঠান ঘিরে রাজশাহী অঞ্চলের তুঁতচাষি, পলুচাষিরা বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। ফলে উৎপাদনের শীর্ষে ছিল এই প্রতিষ্ঠান। অথচ ২০০০ সালের পর থেকে রেশমশিল্পের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। এখনো সেই জের চলছে। যদিও কর্তাব্যক্তিরা রেশমশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন দেখছেন।
১৯৭৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেশম বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৩ সালে ১৩ নম্বর আইনবলে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ সিল্ক ফাউন্ডেশনকে একীভূত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড।
এর পর থেকেই তীব্র জনবলসংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির পদে জনবলসংকট থাকায় একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের প্রথম শ্রেণির ৪৮টি পদের মধ্যে ৩০টি পদই শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ৫১টি পদের মধ্যে ২০টি, তৃতীয় শ্রেণির ৩২৭টির মধ্যে ১৪৭টি ও চতুর্থ শ্রেণির ১০৫টি পদের মধ্যে ৬১টি শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে ১৯৫৯-৬০ সালে রাজশাহী রেশম কারখানা ও ’৭৬ সালে ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানা স্থাপিত হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর দুটি কারখানাই বন্ধ হয়ে যায়।
জানা যায়, বন্ধ হওয়ার সময় অনুমোদিত মোট জনবল রাজশাহী রেশম কারখানায় ছিল ৪৭০ জন ও ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানায় ১১১ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর কারখানা থেকে ২৭২ জন ও ঠাকুরগাঁওয়ের কারখানা থেকে ৮৬ জন জনবলকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ২০০৯ সালে রেশম কারখানা দুটির মোট ৫৮১টি পদ বিলুপ্ত করা হয়।
জানা গেছে, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে রেশম কারখানা দুটি বন্ধ থাকার কারণে মূল্যবান যন্ত্রপাতির ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারখানা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিল, পৌর কর, খাজনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকরণ, নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে এ খরচ মেটানোর জন্য কোনো বরাদ্দ দেয়া হয় না।
সম্প্রতি রাজশাহী রেশম কারখানায় দেখা গেল, প্রতিটি ভবনই তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। এলাকাজুড়ে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য গাছপালা। দেখে মনে হয় না কখনো কোনো দিন এই এলাকায় মানুষের পদচারণ ছিল। তবে দুই মাস আগে স্বল্প মাত্রায় উৎপাদন শুরু হয়েছে।
১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে রেশম সুতা উৎপাদন করা হয় ৩৪ হাজার ৭০০ কেজি। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ৪৫০ কেজি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এটাই কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮৭০ কেজি। উৎপাদনের এই উত্থানপতনের সঙ্গে রয়েছে রেশমগুটি, তুঁত ও রেশম ডিম বিতরণ এবং উৎপাদনের সম্পর্ক। রেশম উন্নয়ন বোর্ড এসব করে থাকে।
বাংলাদেশের রেশম
সিল্ক হলো বমবিকস মোরি বর্গভুক্ত রেশম পোকার গুটি থেকে তৈরি সুতা দিয়ে বোনা এক প্রকার সূক্ষ্ম ও কোমল বস্ত্র। বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চার ধরনের রেশম বস্ত্র তৈরি হয়: মালবেরি, এন্ডি, মুগা ও তসর। প্রথমটি তৈরি হয় বমবিকস বর্গের রেশম পোকার গুটি থেকে, যে পোকা মালবেরি বা তুঁতগাছের পাতা খায়; দ্বিতীয়টি তৈরি হয় ফিলোসেমিয়া বর্গের রেশমগুটি থেকে, যেগুলো ক্যাস্টর গাছের পাতা খায়; তৃতীয়টি অ্যান্থেরিয়া আসমেনসিন বর্গের রেশমগুটি থেকে, এগুলো কুল, তেজপাতা ও কর্পূরের পাতা খায় এবং চতুর্থটি অ্যানথেরি বর্গভুক্ত রেশমগুটি থেকে, ওক গাছের পাতা খায় এই পোকা। মালবেরি রেশম সবচেয়ে মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত।
রেশমগুটি বা কোকুন দেখতে অনেকটা কবুতরের ডিমের মতো। কোকুনের সুতা অবিন্যস্ত, কিন্তু ভেতরে ৫০০ মিটারের বেশি লম্বা একটিমাত্র সুতা সমকেন্দ্রীয়ভাবে বিন্যস্ত থাকে। কোকুন তৈরি হতে তিন দিন লাগে। এর আকৃতি ও রঙে ভিন্নতা দেখা যায়। ৮ দিনের মধ্যে গুটির ভেতর শূককীট পিউপায় পরিণত হয়। পিউপায় পরিণত হওয়ার আগেই কোকুন গরম পানিতে সেদ্ধ করে ভেতরের পোকাটি মেরে ফেলতে হয়। এর থেকেই রেশম সুতা সংগ্রহ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ পিউপা মথে পরিণত হয়ে গুটির প্রান্ত ফুটা করে যদি বের হয়ে আসে, তবে সুতার ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয় এবং রেশম সুতার গুণগত মান হ্রাস পায়। ২ থেকে ৬টি গুটির ভেতরের সুতা একত্র করে একটি রিল তৈরি করা হয়। বাইরের পরিত্যক্ত সুতা পাকিয়ে স্প্যান সিল্ক প্রস্তুত করা হয়, যা থেকে তৈরি হয় মটকা সিল্ক।
রেশম সুতা উৎপাদনের লক্ষ্যে রেশম পোকা প্রতিপালনকে রেশম চাষ বলে। রেশম চাষের তিনটি পর্যায় রয়েছে: তুঁতগাছ চাষ, রেশম পোকা পালন এবং কাপড় তৈরির জন্য রেশমগুটির সুতা পৃথক করা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে পুরোপুরি কৃষিভিত্তিক, তৃতীয় পর্যায় মূলত শিল্পগত, নিষ্পন্ন হয় কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানে, যা ফিলাচার নামে পরিচিত। বাংলাদেশে বছরে চার থেকে পাঁচটি রেশম মৌসুম থাকে। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে একটি রেশম মৌসুম ৩০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। প্রধান প্রধান মৌসুম হচ্ছে চৈত্র, জ্যৈষ্ঠ ও অগ্রহায়ণ।
সুতা থেকে থান কাপড়
রেশম সুতা থেকে প্রথমে হ্যান্ডলুম কিংবা পাওয়ার লুমে থান কাপড় প্রস্তুত করা হয়। এতে তৈরি হয় শাড়ি, কামিজ, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, ওড়না, শার্ট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, স্কার্ফ, রুমাল, টাই, বেবি ওয়্যার ইত্যাদি। শাড়ি এবং অন্যান্য তৈরি পোশাকে বৈচিত্র্য আনার জন্য বিভিন্ন ধরনের নকশা করা হয়। এসব নকশায় রং, রঙিন সুতা, জরি, পুঁতি, কাচ, প্লাস্টিকসহ নানাবিধ উপকরণ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
রেশমের ঐতিহ্যবাহী এবং অতি জনপ্রিয় শাড়ির নাম গরদ। রাজশাহী অঞ্চলে তৈরি এই শাড়ি রেশমের স্বাভাবিক রঙের জমিনের বিপরীতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লাল বা সবুজ এবং কখনো সোনালি জরির কাজ করা পাড় থাকে। পাড়ে রেখা, ত্রিভুজ ও জ্যামিতিক আকার সমৃদ্ধ সূক্ষ্ম নকশা থাকে। স্বাভাবিক রঙের রেশমি কাপড়ের নাম কোরা; ক্ষারি বা ধোয়া হলে তার নাম হয় গরদ। গরদের শাড়ির পাড়ের রঙ যা-ই হোক না কেন, শাড়ির জমিন উজ্জ্বল সাদা বা হাতির দাঁতের বর্ণ হয়ে থাকে। রেশমের তৈরি অপর একটি জনপ্রিয় শাড়ির নাম কাতান। ভারতের উত্তর প্রদেশের বেনারস থেকে আসা মোহাজেররা ঢাকার মালিটোলা, বেচারাম দেউড়ী, দক্ষিণ মৈশুন্ডি এবং লালমোহন সাহা স্ট্রিটে বেনারসি কাতান বয়ন শুরু করেন। পরে এরা মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে বসতি স্থাপন করেন। কাতান বোনার জন্য গর্ত তাঁত ব্যবহার করা হয়। এ তাঁতে শাড়ির নকশা তোলার কাজে জ্যাকার্ড ব্যবহার করা হয়। টানা ও বানাতে রেশমি সুতা ও বুটির জন্য জরি ব্যবহৃত হয়। পাকানো রেশমি সুতার নাম কাতান। বেনারসি শাড়িতে পাকানো সুতা ব্যবহৃত হয় বলে এর অপর নাম কাতান।
বাংলায় মালবেরি
বাংলায় কখন মালবেরি রেশম প্রস্তুত শুরু হয়, তা জানা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিত, একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান উপকরণ হিসেবে এই রেশম তৈরি প্রক্রিয়ার ইতিহাস শুরু হয়েছিল বহু শতক আগেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তেরো শতকে সুদূর ইতালিতে এই রেশম গাঙ্গেয় সিল্ক নামে পরিচিত ছিল। ইতিহাসে দেখা যায়, বাঙালি গৃহস্থরা রেশম উৎপাদনের প্রথম তিনটি পর্যায় সম্পন্ন করে: মালবেরি বা তুঁত চাষ, রেশমগুটি লালনপালন এবং সুতা কাটা। তারপর সেই সুতা নিকটবর্তী গ্রাম বা শহরের দক্ষ তাঁতিদের কাছে বিক্রি করা হয় বিভিন্ন প্রকার রেশম বস্ত্র তৈরির জন্য। বাংলায় এত বেশি রেশম উৎপাদিত হতো যে তা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করার পর রপ্তানি হতো প্রচুর। সিল্কের এই বাজারই প্রথম ইউরোপীয় বণিকদের বাংলায় আসতে উৎসাহিত করে।
এখানে বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের পর ক্রমশ তারা বাংলার তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং বস্ত্র রপ্তানির পরিবর্তে প্রসারণশীল বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল রপ্তানি শুরু করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৎপরতায় ১৮৩৫ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের এক শ রেশম নিষ্কাশন কেন্দ্র নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। প্রতিবছর প্রায় ৪০০ টন রেশম তৈরির কাঁচামাল বিদেশে চালান হয়ে যায়। রেশমের এই রপ্তানি বাণিজ্য বেশ কিছুকাল জমজমাট থাকে। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকে মহামারী আকারে রেশমকীটের রোগবিস্তার এবং কারিগরি অচলাবস্থা সৃষ্টির ফলে বাংলার রেশমশিল্প বিদেশের বাজার হারায়।
বিশ শতকের প্রথম দিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলার রেশম বস্ত্রের কদর কমে গিয়ে সেখানে কাশ্মীর ও মহীশূর সিল্কের চাহিদা তৈরি হয়। ১৯৩০ সালের মধ্যে চীন ও জাপানের সিল্ক বাংলার রেশমের স্থান দখল করে, এমনকি বাংলায়ও এসব সিল্ক আসতে শুরু করে। এর ফলে বাংলায় কর্মসংস্থানেও বিপর্যয় দেখা দেয়। ১৮৭০-এর দশকের এক হিসাবে জানা যায়, রাজশাহীতে সিল্ক উৎপাদন থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হতো; ১৯০১ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১ হাজার এবং ১৯২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬০০ জনে। এই বিপর্যয় বাংলার তৎকালীন সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
১৯০৮ সালে সরকার রেশম পোকা চাষের জন্য একটি বিভাগ চালু করে। এটাই ছিল রেশমশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার কাজে প্রথমবারের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। বাংলায় তুঁত চাষের এলাকা ১৮৯৬ সালে ছিল ৫৪ হাজার হেক্টর, ১৯১৪ সালে তা দাঁড়ায় ৭ হাজার হেক্টরে এবং ১৯৩৭ সালে ৪ হাজার হেক্টরে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পরে অধিকাংশ রেশম উৎপাদনের এলাকা ভারতের মধ্যে পড়ে। বাংলার তুঁত চাষ এলাকার ১০ ভাগের কম অংশ পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। তাতে প্রায় ২ হাজার লোক কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
পূর্ব বাংলার রেশম উৎপাদনকারীরা ভারতের রেশম বস্ত্র তৈরির কারখানা ও সেখানকার বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পাকিস্তান সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ এতে ছিল না। রেশমশিল্পকে ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে তোলার সুযোগ দেয়া হয়, কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোক্তা এগিয়ে আসেনি; আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রেও কোনো সংরক্ষণমূলক শুল্কনীতি ছিল না। সরকার রেশম উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির ব্যাপারে অবাধ সুযোগ দেয়। অবশ্য প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ রেশমশিল্পের উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর ফলে ১৯৬২ সালের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরি চালু হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপ রেশম উৎপাদনকারীদের অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বিভাগকালীন সামান্য ৩০০ হেক্টর তুঁত চাষ এলাকা ১৯৭১ সালে ৫০০ হেক্টর পর্যন্ত প্রসারিত হয় এবং তা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের আনুমানিক ৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রেশমশিল্পের উন্নয়নের জন্য অধিকতর সুসংবদ্ধ নীতি গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া এই শিল্প বৈদেশিক সাহায্য এবং কারিগরি সহায়তা লাভ করে। ১৯৭৭ সালে সিল্ক খাতের কার্যক্রম সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে উন্নয়ন ধীরগতিতে চলে। ১৯৮০-র দশকে একটি মূল্যায়ন দলের অভিমত অনুসারে সেরিকালচার বা রেশমগুটির চাষ সরকারের একটি গৌণ খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়, যদিও গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং আয়ের উৎস হিসেবে এ শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতোমধ্যে কতিপয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রেশম উৎপাদনে এগিয়ে আসে। স্থানীয়ভাবে কিছু সাফল্য অর্জিত হলেও অধিকাংশ উদ্যোগই নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। ১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে দেশে তুঁত চাষ এলাকার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার হেক্টর এবং রেশম খাত ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিল বলে ধারণা করা হয়। সে সময় বাংলাদেশের রেশম উৎপাদনের পরিমাণ ভারতের সিল্ক উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক ছিল।
উৎপাদন প্রক্রিয়া
রেশম উৎপাদন একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। রেশমগুটি থেকে রেশম তৈরি করা হয়। রেশম গুটি আসলে রেশম মথের শুঁয়াপোকা; এদের একমাত্র খাদ্য তুঁত পাতা। রেশমকীট ডিম থেকে জন্মায় এবং গুটিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর্যায় শেষ করে রেশম মথ হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্ত্রী মথ তখন কালচক্র পুনরায় শুরু করার জন্য ডিম পাড়ে। গুটিবদ্ধ অবস্থায় রেশম পিউপা বা কীটগুলোকে মেরে ফেলে সেগুলোকে সেদ্ধ করে সুতা ছাড়ানো হয় এবং পরে তা গোটানো হয়। এই সুতা বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র তৈরির জন্য নানাভাবে প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশে প্রায় সব ধরনের রেশমগুটিই গ্রামের হাটগুলোতে বাঁশের ট্রেতে করে প্রতিপালন করা হয়। রেশমগুটি পালন খুব শ্রমসাপেক্ষ, বিশেষ করে মৌসুমের শেষে যখন হাজার হাজার রেশম পোকা গোগ্রাসে পাতা খায়, তখন সেগুলো পালনের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমের প্রয়োজন হয়। রেশম রং করা, বোনা, ছাপা প্রভৃতি কাজ গ্রামের ছোট কারখানা এবং শহরের উন্নত ফ্যাক্টরিতে সম্পন্ন হয়। বাংলায় যারা সিল্ক তৈরি করে (তবে নিজেরা পরতে পারে না), তাদের মধ্যে রেশমের ভিন্ন ধরনের নাম প্রচলিত আছে। উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে এই নামকরণ হয়। যেমন রেশমগুটি পালনকারীকে বলা হয় বোসনি, রেশমগুটিকে পোলু, গুটির সুপ্তাবস্থাকে চোঞ্চ বা বিজন গুটি, গুটি মেলার বাঁশের চালনকে বলে চন্দ্রোকি, ১,২৮০টি রেশমগুটিকে কাহন, রেশমকীটের রোগকে কোটা এবং জীবাণু সংক্রামক মাছিকে বলা হয় উজি।
বাংলাদেশের রেশম বাজার পুরোপুরি স্থানীয়। কখনো কখনো স্থানীয় সরবরাহের বাইরেও রেশমের চাহিদা দেখা যায় এবং বৈধ ও অবৈধ উপায়ে প্রধানত ভারত থেকে রেশম বস্ত্র আমদানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত শ্রেণির জীবনে রেশমের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। রেশম শাড়ির আভিজাত্য দামি সুন্দর পোশাকের চেয়ে অনেক বেশি। সিল্কের বিভিন্ন নমুনা ও ডিজাইনের জন্য বাংলা ভাষায় বিশেষ কিছু নাম প্রচলিত, যেমন গরদ, মটকা, বেনারসি প্রভৃতি।

ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top