skip to Main Content
gaming-into

ফিচার I গেম, গেমার এবং গেমিং

একসময় যেকোনো পিসি গেমকে আসক্তির মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এতে কেবল সময় নষ্টÑ এমন কথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে গেম, গেমার আর গেমিং হয়ে উঠেছে আয়ের উৎস। গত কয়েক বছরে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী গেমকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আবার অনেক দেশেই পিসিতে গেমিং, গেম বানানো এবং এ-সংক্রান্ত বিষয়-আশয় নিয়ে চালু হয়েছে উচ্চশিক্ষা। লিখেছেন নাজমুল হক ইমন

একসময় যেমন রক সংগীত হঠাৎ খুব জনপ্রিয় হয় এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, গেমিংয়ের ব্যাপারটিও ঠিক তেমনই। গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে অনেক গেম ছিল। কিন্তু বর্তমানের মতো এর তেমন প্ল্যাটফর্ম ছিল না। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে গেমিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই এই প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়েছে নিজের ক্যারিয়ারের অংশ হিসেবে।
মোবাইল গেম শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৭৪ কোটি ৭০ লাখ গেমার রয়েছেন। এর মধ্যে শুধু মোবাইল হ্যান্ডসেটে গেম খেলেন ১২০ কোটি মানুষ। এমন পরিসংখ্যানই বলে দেয়, শিল্প হিসেবে এর সম্ভাবনা কত! আর সেই বাজার ধরতেই দেশের গেম ইন্ডাস্ট্রিকে আরও পোক্ত করার জন্য সদস্য কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কর্মশালা করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)। ইতিমধ্যে দেশে সাড়া জাগানো বেশ কয়েকটি গেম তৈরি করেছে কোম্পানিগুলো। যা অ্যাপস্টোরগুলোতে বেশ সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশি কয়েকটি গেমের মিলিয়ন ডাউনলোডের রেকর্ডও রয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া কর্মশালায় বক্তারা বলেন, গেম ডেভেলপমেন্ট ও গেম অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় এই খাতে ক্যারিয়ার গড়তে পারবে। কর্মশালায় বাংলাদেশের গেম ডেভেলপমেন্ট খাতের লক্ষ্য, বেসিক গেমিং, গেম ডেভেলপমেন্ট, অ্যানিমেশন, সাউন্ড ইফেক্ট, পোস্ট ইফেক্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে গেমার
সন্তানের সারা দিন গেমস নিয়ে পড়ে থাকাটা অভিভাবকের জন্য চিন্তার বিষয়। কারণ, এমনিতেই তা একটা নেশা। তার ওপর কম্পিউটার গেমসের পেছনে যে পরিমাণ সময় ব্যয় হয়, তা পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এ ধারণাটা বদলে যাচ্ছে। একটা গেমিংয়ের প্রতিযোগিতা দেখতে যখন ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ জড়ো হয় এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো তা লাইভ টেলিকাস্ট করে, তখন তা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। সেখানে চলছে গেমিংয়ের পেশাদার লিগ। এর পুরস্কার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে বিশাল এক আয়োজন। তাই বর্তমান বিশ্ব অভ্যর্থনা জানাচ্ছে ই-স্পোর্টকে। হতে পারে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় খেলা নয়। কিন্তু এর জনপ্রিয়তা কোনো অংশে কম বলা যাচ্ছে না।
গেমিং খাতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখছে এখনকার প্রজন্ম। এর অর্থ জীবনের বড় একটা সময় তাদের কাটবে কম্পিউটার পর্দার সামনে। এ পথে পা বাড়িয়েছেন অনেকে এবং এর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিজয়ীরা সেলিব্রিটি হয়ে গেছেন। তাদের নিয়মিত সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন সাংবাদিকেরা। শুনতে অদ্ভুত হলেও শখের গেমারদের অনেকেই এখন পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন ভিডিও গেমিং। পছন্দের গেম খেলেই কেউ কেউ আয় করছেন বিপুল অর্থ। এমনই এক শখের গেমার ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি ইন ফুলারটনের ছাত্র রবার্ট লি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়াশোনার পর পেশা হিসেবে গেমিংকে বেছে নেন তিনি। এ সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে লি বলেন, ‘আমি চিন্তা করে দেখলাম, স্কুল তো থাকছেই। তবে ভিডিও গেম খেলে টাকা আয়ের সুযোগ বেশি দিন থাকবে না।’ প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট ম্যাশএবল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তিন বছরের ব্যবধানে লি এখন পেশাদার ‘লিগ অব লিজেন্ডস’ গেমার। গেমিংয়ে যা আয় করেন, তাতে অনায়াসে চলে যাচ্ছে তার জীবনযাপনের খরচ। এই জগতে তার পরিচিতি ‘রবার্টিএক্সলি’ নামে। লির মতো ভিডিও গেমিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের সংখ্যা যে শুধু বাড়ছে তা নয়, বিভিন্ন ভিডিও গেম টুর্নামেন্ট দেখতে আগ্রহীর সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন। লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টেপলস সেন্টারে আয়োজিত ‘লিগ অব লিজেন্ডস’ টুর্নামেন্টের ফাইনাল দেখেছেন বিশ্বব্যাপী তিন কোটি বিশ লাখ দর্শক। স্টেপলস সেন্টারের ১৮ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল দুই ঘণ্টার মধ্যে। প্রায় একই রকমের ঘটনা ঘটেছে সেপ্টেম্বরে আয়োজিত ‘ডোটা ২’ টুর্নামেন্টের ফাইনালে। দুই লাখ দর্শক দেখেছেন এর ফাইনাল। তাতে ৫ সদস্যের বিজয়ী দল পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল পঞ্চাশ লাখ মার্কিন ডলার। এই টুর্নামেন্টগুলো সরাসরি সম্প্রচারও করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নিজেদের অনলাইন চ্যানেলে ডোটা ২ টুর্নামেন্টের ফাইনাল প্রচারের ব্যবস্থা করেছিল স্পোর্টস চ্যানেল ইএসপিএন।
অনলাইন স্ট্রিমিং দেখে লাখো মানুষ
এখন টাকা কামানোর আরেকটি উপায় হচ্ছে ভিডিও গেমিং। এমনকি এটা খেলতে গিয়ে অনেক আশ্চর্য মানুষের সঙ্গেই ইন্টারনেটে পরিচয় হয়ে যায়। টুইচ ইন্টারনেটে এখন গেম খেলার জন্য জনপ্রিয় একটি প্ল্যাটফর্ম। আমাজন ১০০ কোটি ডলারে এটি কিনে নেয়। এরপর থেকেই এটি লাখ লাখ গেমারের সামনে তাদের গেম উপহার দিয়ে আসছে।
তৈরি হয়েছে পেশাদার গেমার
বিভিন্ন গেমভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পেশাদার গেমার তৈরি হয়েছে। এসব পেশাজীবীর অনেকেই একবিংশ শতাব্দীর তরুণ। যারা এই খেলাকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছেন তাদের প্যাশন থেকেই। এমন গেম বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অন্তত ৬০ কোটি মানুষ খেলছে এবং প্রায় ১৪০ কোটি ডলার এর থেকেই শুধু আয় হবে ২০২০ সালের মধ্যে। এমনকি অলিম্পিক কমিটি এখন তাদের ইভেন্টে ভিডিও গেম যুক্ত করেছে। সুমাইল হাসান সবচেয়ে তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে অলিম্পিক ই-স্পোর্টসে ১০ লাখ ডলার জিতেছে। শুধু ডোটা গেমটি খেলে অন্তত আড়াই মিলিয়ন ডলার জিতেছে। সে এখন এটাকে পুরোদস্তুর একটা কাজ হিসেবে নিয়েছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ভিডিও গেম
বিশ্বের অনেক দেশের লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এখন জড়িয়ে রয়েছে ভিডিও গেম। তারা চান ভিডিও গেম তৈরি ও খেলায় তাদের ক্যারিয়ার গড়তে। সে জন্য অনেকেই প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানাচ্ছে ব্লুমবার্গ। এদিক থেকে দেশের তরুণেরাও পিছিয়ে নেই। ভিডিও খেলা এবং এর থেকে অর্থ আয় করতে এখন বেশ কিছু তরুণ কাজ করছেন। নিজেরা তো বটেই, অন্যদেরও উৎসাহিত করছেন ভিডিও গেমে। এর থেকে হাজার হাজার ডলার আয় করা সম্ভব হবে বলে তারা এর পেছনে সময় ব্যয় করছেন।
ভিডিও গেমে লাখপতি লাখো কিশোর
ভিডিও গেমিং এখন শুধু নেশা নয়, এটি পেশাও। হাজার হাজার কিশোর এর বদৌলতে হয়েছে লাখ লাখ ডলারের মালিক। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অ্যালেক্স বেলফানজ। ১৮ বছর বয়সী অ্যালেক্স অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতোই প্রতিদিন ক্লাস লেকচার টুকে নেওয়া, সেমিনারে উপস্থিত হওয়া, অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করেন। কিন্তু তিনি প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা এবং সপ্তাহ শেষে বসে কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করেন ভিডিও গেমের পেছনে। তিনি শুধু খেলেনই না, সেগুলো তৈরিও করেন। এর মধ্য দিয়ে অ্যালেক্স অনেক অর্থের মালিক হয়েছেন। ‘জেলব্রেক’ গেম রিলিজ করা হয়েছে, এটি ইতিমধ্যে নয় ডিজিটের ফিগারের মতো আয় করেছে। নিজের তৈরি পুলিশ এবং ডাকাতের একটি ভিডিও গেম নিয়ে বলছিলেন অ্যালেক্স বেলফানজ। গেমটি কয়েক শ কোটিবার খেলা হয়েছে। অ্যালেক্স বেলফানজ হাজার হাজার তরুণের মধ্যে একজন। যে তরুণ বয়সেই গেম নিয়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন। এমন কয়েকজন তরুণ গত বছর অন্তত ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছেন। এর মাধ্যমে এমন একটি জীবিকার কথা বলা হচ্ছে, যেটি গত ১০ বা ৫ বছর আগেও ছিল না। এখন বাস্তবে হচ্ছে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্নভাবে। আরেক ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যান্ড্রু বেরেজা। যে ‘মিনারস হেভেন’ এবং ‘আজার মাইন’ নামের দুটি গেম গত দুই বছরে নির্মাণ ও রিলিজ করেছেন। তিনি ‘রোবলক্স’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, যেখানে একেবারে শিশুরাও গেম তৈরি করে পাবলিশ করতে পারবে। এটিও অনেকটাই অ্যালেক্স বেলফানজের মতোই একটি প্ল্যাটফর্ম। যদিও আমি সহকর্মীদের মতো বার্ষিকভাবে লাখপতি হইনি, কাজের শুরু থেকেই ছয় ডিজিটের অর্থ উপার্জন করে আসছি। বলছিলেন বেরেজা। তার আয়ের অর্থ দিয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। কম্পিউটার সায়েন্সে। তিনি বলেন, আমি জানি না কীভাবে পড়ালেখার পাশাপাশি গেম তৈরি এবং এটা নিয়ে কাজ করার সময় বের করি।
বাংলাদেশে গেম ফেস্ট
বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর পিসি গেমকে অনেক গেমার প্রফেশনাল হিসেবে নিয়েছে। শুধু দেশেই নয়, দেশের গেমাররা দেশের বাইরে গিয়েও গেমিং শুরু করেছে। এক তথ্যে পাওয়া যায়, বাংলাদেশে প্রফেশনাল গেমার ২ লাখের বেশি। এদের অনেকেই শুধু গেমিংয়ে লাখ লাখ টাকাও আয় করছেন। ইদানীং আমাদের দেশে গেমিংয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। সম্প্রতি দেশে হয়ে গেল সবচেয়ে বড় উৎসব। গত ৩ থেকে ৭ জুলাই পাঁচ দিনের গেমিং ফেস্ট অনুষ্ঠিত হয় আইডিবিতে। ‘গিগাবাইট গেমিং ফেস্ট ২০১৮’ নামে। প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গিগাবাইটের সৌজন্যে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) প্রাইভেট লিমিটেড। পাঁচটি ইভেন্ট খেলা হয় ‘সিএস গো’ ‘কড ফোর’, ‘রেইনবো সিক্স’, ‘ফিফা ১৮’ এবং ‘এনএফএসএমডব্লিউ’। এসব গেমে অংশ নেন পাঁচ শতাধিক প্রতিযোগী।
গিগাবাইটের কান্ট্রি ম্যানেজার খাজা আনাস খান বলেন, ‘দেশের গেমিং কমিউনিটিতে ২০০৬ সাল থেকে কাজ করছি। তাই আমরা জানি গেমারদের জন্য কী প্রয়োজন। তাদের দীর্ঘদিন ধরে চাহিদা ছিল দেশে বড় পরিসরে গেমিং ফেস্ট আয়োজন করার। এর ধারাবাহিকতায় ৩ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত সর্ববৃহৎ গেমিং এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যেখানে পুরস্কার ছিল তিন লাখ টাকাসহ অন্যান্য উপহার।
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top