skip to Main Content
art-summit-march-into

ইভেন্ট I শিল্পকলার মহোৎসব

আর্ট সামিটের চতুর্থ আসর সুসম্পন্ন হলো। দেশ-বিদেশের শিল্পীদের কাজ তাতে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়ামের উপস্থাপনরীতি মেনে। লিখেছেন উম্মে তানিয়া

বাংলাদেশের শিল্পচর্চার এই ইতিহাস সমৃদ্ধ ও পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি পৃথিবীতে। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই তাদের সৃষ্টিকে দেশের বাইরে পরিচিত করে তুলতে পেরেছেন। কিন্তু জাতির শিল্পকলাকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরবার চেষ্টা বেশি জরুরি, যা চালিয়ে যাচ্ছে সামদানী ফাউন্ডেশন। ঢাকা আর্ট সামিট (ডাস) দক্ষিণ এশীয় শিল্পকর্মের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। দুজন শিল্পানুরাগী রাজীব সামদানী ও নাদিয়া সামদানীর উদ্যোগে এটি গড়ে উঠেছে। তাঁদের স্বপ্ন, বিশ্ব শিল্পকলায় বাংলাদেশের       কৃতিত্বকে উল্লেখযোগ্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক চিত্রকলা, ফটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন শিল্পকর্মের সংগ্রাহক রাজীব সামদানীর শিল্পকর্ম নিয়ে ভাবনার শুরু ২০০০ সালে। ২০১১ সালে গড়ে তোলেন সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন। ২০১২ সালে শুরু করেন বার্ষিক আয়োজন আর্ট সামিট। এ বছরের ২ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো চতুর্থ আসর।

শিল্পকর্ম দেখার ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শিল্পকলা একাডেমির আদল বদলে দেয় আর্ট সামিট। অনেকটা আন্তর্জাতিক মানের গ্যালারি ও মিউজিয়ামগুলোর মতো করে শিল্পকর্ম উপস্থাপন করা হয়। প্রকৃতার্থে শিল্পকর্ম দেখার জন্য এর অবস্থানগত উপস্থাপন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ সম্পর্কে ব্যাখ্যাও রয়েছে ব্রিটিশ শিল্পী ও শিল্পসমালোচক জন বার্জারের ওয়েজ অব সিইং বইতে। একটা শিল্পকর্ম কোথায়, কীভাবে, কোন পরিবেশে দেখছি, এসবের ওপর নির্ভর করে বদলে যেতে পারে সেই শিল্পকর্মের অর্থ ও ব্যাখ্যা। এই ভাবনার অনেকটাই ধরার চেষ্টা করেছে ঢাকা আর্ট সামিট।

বিদেশের বিখ্যাত শিল্পকলা জাদুঘর যেমন লন্ডনের টেট, নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, দ্য মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, সলোমন আর গুগেনহেইম মিউজিয়াম এবং প্যারিসের সেন্টার পম্পিদুর কিউরেটরদের সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় চিত্রকলাবিষয়ক ভাবনা বিনিময়ের পথ তৈরি করেছে সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন। শুরু থেকে এই উদ্যোগের সঙ্গে রয়েছেন শিল্প নির্দেশক এবং কিউরেটর ডায়ানা ক্যাম্পবেল বেটানকোর্ট। যার মাধ্যমে সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন (সাফ) চেয়েছে বাংলাদেশের সব পর্যায়ের সমকালীন শিল্পী ও স্থপতিদের সৃজনশীলতার দিগন্তকে অবাধ করতে।

প্রদর্শনীতে অংশ নেয় ৩৫টি দেশের ৩০০ জনের বেশি শিল্পী। এই আসরে প্রথমবারের মতো সম্পৃক্ত হয়েছে ইরান ও তুরস্ক। এশিয়ার অজানা ইতিহাস এবং একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় সমকালীন শিল্পকলার উন্নয়ন সামনে রেখে সামিটে দেশি-বিদেশি ১২০ জনের বেশি বক্তার অংশগ্রহণে ছিল মোট ১৬টি প্যানেল আলোচনা ও ২টি সিম্পোজিয়াম। এই অংশটি ছিল খুবই প্রাণবন্ত। কারণ, শিল্পসমালোচক ও শিল্পশিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ছিল বিষয়গত আদান-প্রদানের চিত্তগ্রাহী উপস্থাপন। এই এডুকেশন প্যাভিলিয়ন তৈরি করা হয়েছিল সামদানী আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী মাকসুদুল করিমের নকশায়। বাংলাদেশের শতাধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করেছেন সামিটে। বাংলাদেশি ১২টি সংস্থা বা সংগঠন নিজস্ব শিল্পীদের নিয়ে এই আয়োজনে হাজির হয়েছে। ১২০০-এর বেশি বিদেশি অতিথির সমাগম হয় এবার।

এই প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে ছিল এশিয়ান আর্ট বিয়েনালের ওপর একটি বিশেষ প্রদর্শনী। যেখানে ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশি শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ, এস এম সুলতানসহ অন্য শিল্পীদের শিল্পকর্ম। আর্কাইভিংয়ে সহযোগিতা করেছে জাপানের ফুকোওয়াকা মিউজিয়াম এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শিল্পীদের অংশগ্রহণে মাল্টিস্টেজ পারফরম্যান্স প্রোগ্রাম ছিল এবারের ঢাকা আর্ট সামিটের বিশেষ আকর্ষণ।

৫৫টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল আর্ট সামিটের পার্টনার। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।

শিল্পীদের মধ্যে ১১ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে একজনকে সামদানী আর্ট অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত করেছে সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশন। এই সম্মাননা অর্জন করেছেন শিল্পী মিজানুর রহমান চৌধুরী; মিশ্র মাধ্যমে করা ইনস্টলেশন ‘জাম্প, ২০১২’-র জন্য। এ জন্য শিল্পী ৩ মাসের রেসিডেন্সি পাবেন লন্ডনের ডেলফিয়া ফাউন্ডেশনে।

বর্তমানে সব দেশই নিজেদের শিল্প ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অন্যদের জানাতে এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। নিয়মিত নানা আয়োজন করছে। বিশ্বজুড়েই চলছে এই ধরনের প্রতিযোগিতা। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আর্ট সামিট প্রথম শুরু হয় ২০০৮ সালে। সেটা এখন ইন্ডিয়ান আর্ট ফেয়ার নামে অনুষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর মোট ৭০টি দেশ বিশ্ব আর্ট সামিটের আয়োজক প্রতিষ্ঠান আইএফএসিসিএর সদস্য। এটা প্রতিষ্ঠিত হয় সিডনিতে। প্রথম বিশ্ব সামিট হয় ২০০০ সালে। আগামী বছরের ১১-১৪ মার্চ অষ্টম বিশ্ব আর্ট সামিট হবে কুয়ালালামপুরে। এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করা, অলাভজনক ও সরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা এবং বিশ্বের সঙ্গে শিল্পী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ সহজ করা।

ঢাকা আর্ট সামিট দর্শকদের শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া বা ভাবনার আদান-প্রদানের জন্য বেশ কিছু আর্ট মিডিয়েটর নিযুক্ত করে। যাদের ওয়ার্কশপের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের কাজ সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়া হয়। তাদেরকে গ্রুপ করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে শিল্প ও শিল্পী সম্পর্কে। বিষয়, ধরন, করণকৌশল, ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়।

ঢাকা আর্ট সামিটের এই আয়োজন সময়ের চাহিদা পূরণ করে চলেছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের শিল্পকলায় আমাদের দেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম বা শিল্পকর্ম জায়গা করে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরি শিল্পীদের অনেকেই ছিলেন এবং আছেন, যাঁদের শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক মর্যাদা পেয়েছে, অনেকেই আবার হারিয়েও গেছেন। তাঁদের শিল্পকর্ম সামনে রেখে এগিয়ে গেলে দেশের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিবোধ অনেকাংশে সমৃদ্ধ হবে। ভুবনায়নের এই যুগে যোগাযোগই একমাত্র হাতিয়ার নিজেদের জানান দেয়ার জন্য। সামিটের সহযোগিতায় বাংলাদেশের উদীয়মান শিল্পীরা আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী ও শিল্পসমালোচকদের সান্নিধ্যে এসে নিজেদের ভাবনার জায়গায় কতটা পরিষ্কার ও অধ্যবসায়ী হওয়া দরকার, তার একটা ধারণা পেয়ে যাচ্ছেন।

লেখক: পেইন্টার ও শিল্পবিষয়ক লেখক

ছবি: ঢাকা আর্ট সামিট কর্তৃপক্ষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top