skip to Main Content

ফিচার I জাঁকালো জরি

পোশাক কিংবা অনুষঙ্গের জমিনে এর অস্তিত্বের আবেদনই আলাদা। রাজকীয় উদ্‌যাপনের এলাহি আয়োজনে এর উপস্থিতি মানেই সপ্রতিভ সৌন্দর্য নিশ্চিত

সূক্ষ্ম সোনালি জরির বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো তথ্য পাওয়া যায় সংস্কৃত শ্লোক সংকলন ‘বেদ’ গ্রন্থে। জানা যায়, তিন হাজার বছর আগে হয়েছিল জরির ব্যবহার। সেই থেকে আজ অব্দি এর জয়গান। ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্য কতটা জৌলুশপূর্ণ ছিল, তার সাক্ষী হাতে বোনা কাপড়ে সোনা ও রুপার তৈরি সূক্ষ্ম সুতার এই কারুকাজ।
জরি শব্দটি পার্শিয়ান। অর্থ স্বর্ণ। পোশাকসহ বিভিন্ন লাইফস্টাইল উপকরণ অলংকরণে ব্যবহার করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে ভিনদেশিদের হাত ধরে আসে এই সোনারং জরি। পনেরো শতকে ব্যবহার দেখা যায় মোগল ও রাজস্থানের চিত্রশিল্পে। জরির ব্যবহার জনপ্রিয় করতে মোগল সাম্রাজ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সম্রাট আকবরের অঙ্কিত চিত্রে এর দেখা মেলে। মোগল ইন্সপিরেশনের ফুলেল প্যাটার্ন, সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়কালের ডাঁটাসহ পপি ফুল কিংবা সম্রাট শাহজাহানের সময়ে গাছের পাতার ডিটেইলে জরির উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। এরপরে, সতেরো শতকে মোগল সম্রাট আকবরের পৃষ্ঠপোষকতায় জরির কাজের নান্দনিক নকশার বিচ্ছুরণ ঘটে।
শাড়ি ও বটুয়ার মাধ্যমে জরি জায়গা করে নিয়েছিল মোগল সম্রাজ্ঞীদের আলমিরায়। ধীরে ধীরে এই অলংকরণের মহিমা বিকশিত হয় ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বেনারসে। সেখানে হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বুনে স্বর্ণের তৈরি জরি জুড়ে দিয়ে নকশা করা হতো। কখনো ফুল, কখনো পাতা, কখনোবা কলকা। মোটিফের অনন্য সব প্রকাশ মুগ্ধ করত সে সময়কার ফ্যাশনপ্রেমীদের।
আঠারো শতকে জরি মধ্যপ্রদেশ থেকে ভূপাল ও উজ্জাইনে পৌঁছে যায়। রাজ্য শাসনে তখন ভূপালের বেগমদের যুগ। তারা জরির নকশার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। নিয়মিত ব্যবহার করতেন জরিদার বটুয়া। যাতে নকশা করতে ব্যবহৃত হতো ঝলমলে জরি। একসময় নিজেরাই আগ্রহী হন অলংকরণের ব্যাকরণে। পরবর্তী সময়ে স্থানীয়দেরকেও প্রশিক্ষিত করেন। আবার এ ধারার বিকাশে বাধাও তৈরি করেছিলেন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব। তার সময়ে জরি সুতার অলংকরণে ব্যবহৃত সব উপকরণের দাম বাড়ে অস্বাভাবিকভাবে। এতে শিল্পটি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। উজ্জ্বল এই বয়নকৌশল একসময় সীমানা অতিক্রম করে। ইউরোপিয়ান ব্রোকেড, ইরানিয়ান ভেলভেট এবং চায়নিজ সিল্কেও নিজের উজ্জ্বল উপস্থিতি জানান দেয়।
জরি তৈরি
জরি মূলত মেটালিক থ্রেড। রুপা এর মূল উপাদান। ২৫ মাইক্রন ওজনের রুপার চিকন থ্রেড তৈরি করে তারপরে ৯৮ শতাংশ শুদ্ধ সোনা দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে তৈরি হয় জরি। সাধারণত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হাতের সুনিপুণ দক্ষতায় রুপার চিকন থ্রেড সোনায় মুড়ে নিয়ে তৈরি করা হতো এই চকচকে উপাদান। কারিগরদের ভাষায় এর নাম ‘কালাবাট্টুম’। মূল ব্যবহার ব্রোকেড তৈরিতে। এই শৈল্পিক ফ্যাব্রিকের স্থানীয় নাম ‘কিংখাব’। পরে ইলেকট্রোপ্লেটিং পদ্ধতি আসে। আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি হতে থাকে জরি। সোনা ও রুপার মূল্য বাড়ার কারণে রুপার তার তৈরি করে এর ওপরে সোনা মুড়িয়ে নেওয়া থেকে সরে আসেন কারিগরেরা। রুপার জায়গা নিয়ে নেয় তামা। এই ধাতু ব্যবহারে তার তৈরি করে এর ওপর করা হয় ইলেকট্রোপ্লেটিং। বর্তমানে বিভিন্ন রকম জরি উৎপাদিত হয়।
তালিকায় আছে পিওর জরি, ইমিটেশন জরি, মেটালিক জরি। পিওর জরির ক্ষেত্রে খাঁটি রুপার থ্রেড তৈরি করে এর ওপরে গোল্ড প্লেটিং করা হয়। ইমিটেশন জরিতে রুপার নয়, কপার থ্রেড ব্যবহার করা হয়। এর ওপর সোনারং করতে ব্যবহার করা হয় গোল্ড অথবা গোল্ড লিকার। মেটালিক জরি সম্পূর্ণ কৃত্রিম। প্লাস্টিকওয়্যার কোট করা হয় মেটালের মতো দেখতে অ্যালুমিনিয়ামে।
ফিরে আসা
মোগল রাজাদের জমকালো জরিতে মন হারিয়েছেন বর্তমান সময়ের ডিজাইনার ও ক্রেতারা। যদিও জরি কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখন শুধু সোনালি আর রুপালিতে সীমাবদ্ধ নেই এর গণ্ডি। মিলছে অন্য রঙেও। জরির একটি গুণ হচ্ছে এটি শ্রিংক করে না, অর্থাৎ কুঁচকে যায় না। ফলে ফাইনাল প্রোডাক্টের সারফেসে থাকা ফ্যাব্রিকের সৌন্দর্য কমে না। জরির ব্যবহার এখন বিভিন্ন ফর্মে হয়ে থাকে। যেমন জারদৌসি, কামদানি, মিনাওয়ার্ক। তিনটি ধরনই এখন দারুণ জনপ্রিয়।
জারদৌসি
জারদৌসিতে গোল্ড থ্রেডের নানামুখী নকশি ছাড়াও বিড, সিড পার্লস আর গোটা ব্যবহার করা হয়। আর ফ্যাব্রিক হিসেবে প্রাধান্য পায় হেভি সিল্ক, ভেলভেট ও স্যাটিন। বিয়ের কনের শাড়ি, লেহেঙ্গা, গাউন ও শেরওয়ানি কোটে এর ব্যবহার বেশি।
কামদানি
কামদানি অলংকরণ সম্পন্ন করা হয় সূক্ষ্ম সূচিকর্মের মাধ্যমে। ফ্যাব্রিকও বেছে নেওয়া হয় হালকা ধরনের। থ্রেড ব্যবহার করা হয় সাধারণ মানের। জরির তার চাপ দিয়ে কাপড়ে বসানো হয়। এতে ফ্যাব্রিকে ছোট ছোট উজ্জ্বল ইফেক্ট তৈরি হয়। কারুকার্যটি হাজার বুটি নামেও পরিচিত।
গোটা ওয়ার্ক
গোটা ওয়ার্ক করা হয় গোটা রিবন ব্যবহারে। আর রিবন বুননে সোনালি আর রুপালি তার ব্যবহার করা হয় ওয়ারপে। ওয়েফটে থাকে সিল্ক অথবা কটন থ্রেড।
দেশে বিয়ের পোশাকে জরির অলংকরণ সব সময় নজর কেড়েছে। হোক তা কনের কিংবা বরের। এবারের বিয়ের ট্রেন্ডেও দেখা যাচ্ছে জরির কদর। ডিজাইনারওয়্যারের লেবেলগুলোতে চোখ রাখলে দেখা যায় ডিজাইনারদের আগ্রহ বেড়েছে জরিতে। এই তালিকায় আছে আদ্রিয়ানা এক্সক্লুসিভ, সাফিয়া সাথী, বাটারফ্লাই বাই সাগুফতাসহ অনেক নাম।
জরির পোশাক যেনতেনভাবে সংরক্ষণ করলে নষ্ট হতে পারে এর সৌন্দর্য। সিল্ক অথবা মসলিনে তা মুড়িয়ে রাখতেন আগের দিনের মানুষ। এতে জরির ঔজ্জ্বল্য টিকে থাকত বহুদিন।

 সারাহ্ দীনা
মডেল: প্রজ্ঞা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: মাহমুদা শাড়ী হাউজ
জুয়েলারি: রঙবতী
ছবি: কৌশিক ইকবাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top