skip to Main Content
rosher-dhara-april-into

বিশেষ ফিচার I স্বাতীর সকল রসের ধারা…

নানা রঙের রসগোল্লা। কলকাতার। স্বাদ আর গন্ধও বিচিত্র। বাড়িয়ে দেয় উৎসবের বর্ণচ্ছটা। কলকাতা থেকে লিখেছেন সাগরিকা দেব
দোল উৎসবের সময় দোকানে যেভাবে সারবাঁধা গামলায় থাকে নানা রঙের আবির, ঠিক তেমনি ‘স্বাতী’স ফ্লেভারস অব রসগোল্লা’র আউটলেটে দেখা যায় নানা রঙ ও ফ্লেভারের রসগোল্লা সাজিয়ে রাখা কাঠের হাঁড়িতে। লাল, সবুজ, হলুদ, বেগুনি, ঘন নীল, খয়েরি, ঘিয়ে, চকলেট, গোলাপি, কমলা রংবাহারি সব রসগোল্লা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আপাতত ‘স্বাতী’স ফ্লেভারস অব রসগোল্লার ভাঁড়ারে ২৭০ রকম ফ্লেভারযুক্ত রসগোল্লা রয়েছে। তবে প্রতিদিন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তৈরি হয় ১৫ রকম রসগোল্লা। বাকিটা অর্ডার পেলে বানানো হয়। জানালেন বহুবিচিত্র রসগোল্লার উদ্ভাবক স্বাতী শরফ কাসেরা।
কিন্তু হঠাৎ করে বাঙালির চিরন্তন এই রসগোল্লা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন? যদিও স্বাতীর কলকাতায় বড় হয়ে ওঠা; পড়াশোনা কিংবা বিয়ে—সবকিছু এই শহরেই। কিন্তু আদি বাড়ি রাজস্থান; তাই রসগোল্লা নিয়ে নাড়াচাড়া করাতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন কি হয়েছেন কখনো?
একে একে সব উত্তর মিলল ক্যানভাসের জন্য। ‘বাড়ির কোনো একটি অনুষ্ঠানে প্রচুর মিষ্টি নিয়ে অতিথিরা এসেছিল। মিষ্টি যাতে নষ্ট না হয়, তাই অনুষ্ঠান শেষে অনেক ফ্ল্যাটেই মিষ্টি বিতরণ করা হলো। বাড়ির ঝিদেরও দেওয়া হলো। হঠাৎ রসগোল্লার হাঁড়িটা দিতে গিয়ে একটা আইডিয়া মাথায় খেলে গেল। ভাবলাম, এই রসগোল্লা দিয়ে কিছু একটা এক্সপেরিমেন্ট করলে হয় না! যেই ভাবা সেই কাজ; হাঁড়িটা ফ্রিজে পাচার করলাম আর ভাবতে লাগলাম কী করা যায়!

বাঙালির জীবনে রসগোল্লার কদর এমন যে জন্মের খুশি থেকে শুরু করে মৃত্যুর মতো দুঃখজনক পরিস্থিতিতেও তার উপস্থিতি অগ্রগণ্য। আর রসগোল্লা, ছোট থেকে বড় সবারই প্রিয়। অথচ অনেকে শারীরিক কারণে বা বেশি মিষ্টি বলে অপছন্দের কারণে রসে নিমজ্জমান তুলতুলে ছানার সুখকর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হন; তাদের কথা ভেবে যদি একটা মোচড় আনা যায়, তাহলে কেমন হয়? সেই ভাবনা থেকে কাজ করতে শুরু করলাম ফ্লেভারড রসগোল্লার ওপর। আমার রসগোল্লার স্পেশালিটি হলো এতে কোনো কৃত্রিম রঙ, এসেন্স বা রসে চিনি দেওয়া হয় না। ছানাকে মথে নেওয়ার সময় ফলের শাঁস এবং খুব অল্প চিনি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর ভালো করে মেখে নেওয়া হয়। রসেও চিনি ব্যবহৃত হয় না।

শুধু ফলের রস। তাতে রসগোল্লা ফোটানো হয়। বলগুলো ভেসে উঠলে ফোটানো ফলের রসসুদ্ধ নামিয়ে নিতে হয়। ফলের প্রকৃত মিষ্টতা, গন্ধ ও স্বাদ বজায় থাকে পুরোমাত্রায়। কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা আম এবং দু-চারটে রসগোল্লার আইটেম রয়েছে যেখানে রসে হালকা চিনি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ উৎসবে বিশেষ ফ্লেভারড রসগোল্লা তৈরি করা হয়; যেমন হোলিতে ঠান্ডাই শরবতের মতো থাকছে ‘ঠান্ডাই রসগোল্লা’, ‘পাইনাপেল ঠান্ডাই রসগোল্লা’।
এ ধরনের রসগোল্লা আগেও ছিল কি না, সে প্রসঙ্গে স্বাতী শরফ জানালেন, প্রথম ন্যাচারাল ফ্লেভারযুক্ত রসগোল্লার জন্ম তাঁর হাতেই। আগেও পাওয়া যেত দু-তিন রকম ফ্লেভারড রসগোল্লা। কিন্তু পার্থক্য হলো, আগে ছানায় রঙ ও এসেন্স যোগ করা হতো। তিনিই প্রথম, যিনি চিনি ছাড়া ফলের শাঁস ও রস নিয়ে রসগোল্লা তৈরির নতুন দিক খুলে দিয়েছেন; তাই তাঁকে ‘মাদার অব ফ্লেভারড রসগোল্লা’ বললে বাড়িয়ে বলা হয় না।

রসগোল্লা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন কি না জানতে তাঁর দিকে যখন নজর পড়ল, খেয়াল করলাম, আনন্দের অনুভূতি উপচে পড়ছে দুচোখে। বললেন, ‘শুনলে অবাক হবেন, আমি এই ব্যবসা শুরু করি ২০১৬ সালে। রসগোল্লা তৈরি কীভাবে হয় শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, ঠিক ততটাই উল্টো। অবশেষে অশেষ অনুশীলনের পর নিখুঁতভাবে তৈরি করতে শিখে নিয়ে আমার আবাসনের পড়শি আর বন্ধুদের সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানাতে শুরু করি। টুকটাক অর্ডার আসতে শুরু করে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে প্রচার পায় ‘আহারে বাংলা’ ফুড ফেস্টিভ্যালে। কলকাতার সব সংবাদমাধ্যম আমার রসগোল্লাকে তুলে ধরে গোটা বিশ্বে।

স্বাতী শরফ

খাদ্যরসিকদের ভিড়ে লম্বা লাইন পড়ে যেত আমার স্টলের সামনে। তারপর ধীরে ধীরে একটা টিম তৈরি করতে হলো। কারণ, একার পক্ষে তখন সবকিছু সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। বলা যায়, সেই থেকে শুরু। রসগোল্লার এই নতুন ভাবনা গড়তে গিয়ে আমাকে কোনো সমস্যার মুখে পড়তে তো হয়ইনি, উল্টো সবার সাহচর্যে অনেক সহজ হয়ে গেছে কাজ, ঠিক যেমন মসৃণ প্লেন টেক অফ। ব্যানানা, লবঙ্গ, বেরি, সবুজ আপেল, কেশর বাদাম, রোজ পেটাল, পেস্তা ক্রাশ, কমলা, চন্দন, পুদিনা, কাঁচা আম, তুলসী, আদা, কাঁচা লঙ্কা, মিষ্টি আম, মৌরি, নারকেল, পেয়ারা, নাশপাতি, এলাচি, লিচু, আনারস, জিরা, ফুচকা— এ রকম নানা ফ্লেভারের রসগোল্লা এখানে পাবেন। বিয়ে, অন্নপ্রাশন কিংবা বেবি শাওয়ার অনুষ্ঠানে তত্ত্ব হিসেবে খুব সুন্দর বাক্সে সাজিয়ে রসগোল্লা সরবরাহ করা হয়। তবে গ্রিন চিলি, ফুচকা, তরমুজ, বাটার স্কচ, বেরি ফ্লেভারের চাহিদা বেশি। আপাতত নিউ আলিপুরে একটিমাত্র দোকান রয়েছে। ইচ্ছে রয়েছে কলকাতা ও কলকাতার বাইরে ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে কিছু আউটলেট খোলার। কলকাতার বাইরে পাঠানোর মতো প্যাকেজিং ব্যবস্থা এখনো চালু করিনি। সে রকম অর্ডার থাকলে আমি টিম নিয়ে চলে যাই সেখানে।

সাক্ষাৎকারের শেষে এসে একটা রেসিপি জানতে না পারলে অপূর্ণতা থেকে যায়। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, রেসিপি সব এক, শুধু পাল্টে যাচ্ছে ফল এবং বানানোর প্রক্রিয়া, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে— রসগোল্লা যখন খাচ্ছেন, ঠিক ফুচকার জলের মতো রসটাও চুমুক দিয়ে পান করুন। কারণ, রসে নেই চিনি, তাই ক্ষতির কোনো শঙ্কা নেই। আর সে কারণে ‘স্বাতী’স ফ্লেভারস অব রসগোল্লার ট্যাগলাইন হলো ‘খাও অউর পিও’।

ছবি: স্বাতী’স ফ্লেভারস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top