skip to Main Content

ফিচার I ঐতিহ্যের বিনির্মাণ

ভুবনভোলানো জামদানি নিয়ে বিশ্ববাসীর বিস্ময়ের অন্ত নেই। সেই বিস্ময়কে আরও বাড়াতে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের উদ্যোগ আর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষণায় শুরু হচ্ছে দেড় মাসের প্রদর্শনী। উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন শেখ সাইফুর রহমান

শাড়ি: বেঙ্গল ফাউন্ডেশন  মডেল: মায়িশা

জামদানি এক অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম; বাংলাদেশের অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রাচীন বাংলার আদি হস্তচালিত তাঁতশিল্প-পরম্পরার সঙ্গে এর রয়েছে বিশেষ যোগসূত্র। অসাধারণ নকশায় সমৃদ্ধ জামদানি বস্তুত মসলিনেরই একটি প্রকার। ঔপনিবেশিক যুগের বিলাতি বস্ত্রের অনুপ্রবেশসহ সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এই বয়নশিল্প। এই হাতে বোনা বিস্ময় বস্ত্রের রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস, যা আমাদের কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করে যায়। বাংলা আর পুন্ড্রে এই বস্ত্র তৈরির উল্লেখ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মেলে কৌটিল্যের বিবরণীতে। সেই সুতিবস্ত্র, যা আজও আমাদের কাছে বিস্ময়—তৈরি হয় টানা আর ভরনার বিশেষ বয়নকৌশলে; নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য সমান্তরালে ভরনা বরাবর ব্যবহার করা হয় আলাদা সুচ; একে বলা হয় কান্ডু।

শাড়ি: টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির  মডেল: প্রিয়াম

স্পর্শকাতর এই শিল্পের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পারাটাই হলো আজকের মূল চ্যালেঞ্জ। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে বয়ননৈপুণ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীরা কতটা আয়ত্ত করতে পারছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে এই শিল্পপরম্পরার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা। বিশ শতকের সূচনায় বিভিন্ন ধরনের মিলের শাড়ির সহজলভ্যতায় জামদানিশিল্পের ক্রমপতন পরিলক্ষিত হয়। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বয়নশিল্পীরা তাদের পেশা পরিবর্তন করছেন; বিভিন্ন ধরনের উপকরণের ব্যবহার আর সহজ নকশার প্রতি আকর্ষণের ফলে অবস্থার আরও অবনতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ইউনেসকো ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জামদানিকে ইনট্যাজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। কুটিরশিল্পের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এগিয়ে এসেছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে, যা জামদানি শাড়ির ক্রমবিলুপ্তি ঠেকাতে সহায়ক হবে।

শাড়ি: কুমুদিনী  মডেল: রিফা

জামদানি নামের সৃজনকর্মে প্রয়োজন দক্ষতা, শ্রম এবং সময়। একে টেকসই করার জন্য চাই যথাযথ বিপণন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। পক্ষান্তরে, পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক বয়নশিল্পীদের এই পেশায় থাকতে উৎসাহিত করবে। কিন্তু ক্রমসংকুচিত বাজারের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজার বিস্তারে এরপরই আসে আন্তঃপ্রজন্ম দক্ষতা বিনিময়ের বিষয়। জামদানির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য বয়নের নানা ক্ষেত্রে উন্নতি প্রয়োজন। সুতা থেকে নকশা—প্রতিটি ধাপেই। এই শিল্পের পুনরুজ্জীবনে অনুঘটক হতে পারে ঐতিহ্যগত শিক্ষা প্রজন্ম পরম্পরায় ছড়িয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা। জামদানির বহুমাত্রিক ব্যবহার এর বাজার বিস্তারে সহায়ক হবে।
এসব বিষয় সচেতনভাবে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ জামদানি বয়ন ও বয়নশিল্পীদের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ইউএস অ্যাম্বাস্যাডারস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশনের আওতায় দীর্ঘ গবেষণায় তুলে আনা হয়েছে অন্তত ২০০ আদি ডিজাইন। এর মধ্য থেকে ৬৭টি নকশা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অর্থায়নে প্রকাশ করা হয়েছে ‘ঐতিহ্যের জামদানি নকশা’ শিরোনামে একটি বই। স্মৃতি ও শ্রুতিনির্ভর এই শিল্পের এটাই প্রথম কোনো মুদ্রিত দলিল।

শাড়ি: আড়ং  মডেল: প্রিয়াম

এরপরেই হাতে নেওয়া হয় জামদানি উৎসব প্রকল্প। এটি দুই বছরের নিরলস প্রয়াসেরই ফসল। দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন সংগ্রাহক এবং বিদেশের বিভিন্ন জাদুঘরের সংগ্রহ থেকে ৫০-২৫০ বছরের পুরোনো জামদানি এবং জামদানির ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে। আর তা থেকে করা শাড়ির নকশা নিয়ে বিনির্মাণ করা হয়েছে জামদানি। হাতে কাটা ২০০ কাউন্টে সুতা টানায় ও ভরনা ব্যবহার করা হয়েছে এসব জামদানির বয়নে। আর কিছু শাড়ি বুনতে সময় লেগেছে কয়েক মাস।
এই উৎসবের মূল ভাবনা বস্তুত বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের নির্বাহী সদস্য এবং সাবেক সভাপতি রুবি গজনবীর। এরপর উৎসবকে একটা কাঠামোয় দাঁড় কাজটা করেন নির্বাহী সদস্য এবং সাবেক সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা। আর এই মহাযজ্ঞকে বাস্তবায়িত করতে পৃষ্ঠপোষণার দায়িত্ব সানন্দে গ্রহণ করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। এমনকি এই উৎসবের অনেক দায়িত্বই এই প্রতিষ্ঠান পালন করে যাচ্ছে।
জামদানি উৎসবের মূল আকর্ষণ প্রদর্শনী। এতে স্থান পাবে ১৯টি অ্যান্টিক জামদানির পাশাপাশি ৫০-২৫০ বছরের পুরোনো বিভিন্ন জামদানির বিনির্মিত সংস্করণ। আমাদের বয়নশিল্পীদের অনন্য বয়ননৈপুণ্য দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে এই প্রদর্শনী।
জামদানির উৎকর্ষকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করার অভিপ্রায়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষণায় ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত এক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে। ‘ঐতিহ্যের বিনির্মাণ’ শিরোনামের এই উৎসবে প্রদর্শনী ছাড়াও রয়েছে সেমিনার। পাশাপাশি সোনারগাঁকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটি ঘোষণার জন্য বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দেশ ও বিদেশের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত ১৯টি অ্যান্টিক শাড়ি প্রদর্শিত হবে প্রদর্শনীতে। যা ৫০ থেকে ২৫০ বছরের পুরোনো। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তিগত সংগ্রাহক ও বিশে^র বিভিন্ন দেশের জাদুঘরের কাছ থেকে প্রাপ্ত ছবি থেকে নতুন করে শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে; যা এই প্রদর্শনীতে স্থান পাবে। এই প্রদর্শনী কিউরেট করছেন ডিজাইনার, গবেষক, কিউরেটর এবং কারুশিল্প পরিষদের সাবেক সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা।

শাড়ি: অরণ্য  মডেল: রিফা

এসব শাড়ি তৈরি করেছেন আমাদের দক্ষ বয়নশিল্পীরা। আর এই অনুষ্ঠানের চার এক্সিকিউটিং পার্টনার আড়ং, কুমুদিনী, টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির, অরণ্য এ ক্ষেত্রে রেখেছে বিশেষ ভূমিকা। এ ছাড়া বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের জন্য কিছু শাড়ি বোনা হয়েছে জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের তত্ত্বাবধানে।
এই উৎসবে বেঙ্গল কেবল পৃষ্ঠপোষক নয়, বরং যথার্থ পার্টনার হিসেবে তাদের অবদান রাখছে। সোনারগাঁকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটি করার ক্ষেত্রে কারুশিল্প পরিষদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে বিশেষভাবে সহায়তা করছে বেঙ্গল। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরীর নাম। সার্বিক তত্ত্বাবধান, উদ্যোগ আর উৎসাহ এই উৎসবকে সাফল্যমন্ডিত করার পথে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
উৎসব শুরু ৬ সেপ্টেম্বর। তবে এর আগের দিন ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস কাউন্সিলের তিন বিচারক ও উৎসব উপলক্ষে ঢাকায় আসা অন্য অতিথিরা সোনারগাঁ সফর করবেন। এই সফরের আগে ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তাদেরকে সোনারগাঁ সম্পর্কে অবহিত করা হবে। এ জন্য আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ ব্রিফিং সেশন। উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য সোনারগাঁয়ের ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস সিটির মর্যাদাপ্রাপ্তি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর এ ব্যাপারে যথাযথ সহায়তা করেছে।
৭ সেপ্টেম্বর, উদ্বোধনের পরের দিন রয়েছে সেমিনার। তিন সেশনের একাধিক বিষয়ে নিবন্ধ উপস্থাপন করবেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। এই তালিকায় আছেন ক্র্যাফটস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার সম্মানিত উপদেষ্টা অশোক চ্যাটার্জি, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের কিউরেটর অ্যাভালন ফদারিংহাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ, জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুবি গজনবী, জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট হামিদা হোসেন, ডিজাইনার, গবেষক ও কিউরেটর চন্দ্র শেখর সাহা, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা আবেদ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপপরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া রয়েছে একাধিক প্যানেল আলোচনা। আর দ্বিতীয় সেশনে সমস্যা আর চ্যালেঞ্জ নিয়ে দুই বয়নশিল্পীর সঙ্গে আলোচনা করবেন জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাইফুর রহমান। শেষ সেশনে জামদানি বয়নে আর্থিক সংকট আর টেকসই পরিস্থিতি নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেবেন আইপিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম, এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং উদ্যোক্তা রোকেয়া আফজাল রহমান।
এর আগে জামদানি নিয়ে দুটি প্রদর্শনী হয়েছে। আড়ংয়ের আয়োজনে। ১৯৮১ আর ২০১০। দুটি ছিল উঁচু মানের কাজ। তবে এবারের এই আয়োজনকে ধ্রুপদি না বললে সত্যের অপলাপ হবে। বিশ্ববাসী দেখবে বাংলাদেশের বয়নশিল্পীদের মুনশিয়ানা। কেবল দেখবে না বিস্মিত আর বিমোহিত হবে তাদের বয়ননৈপুণ্যে উদ্ভাসিত কাপড়কাব্যে।

sksaifurrahman@gmail.com

মেকওভার: পারসোনা
ছবি: ক্যানভাস এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশন
কৃতজ্ঞতা: আড়ং, কুমুদিনী, টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির, অরণ্য, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন

রুবি গজনবী

উৎসব সমন্বয়ক ও জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের নির্বাহী সদস্য

বাংলাদেশে জামদানি নিয়ে আমার কাজের অভিজ্ঞতা ৪০ বছর হবে। কৃত্রিম রঙে অভ্যস্ত বয়নশিল্পীদের একসময় অনেক বোঝাতে হয়েছে প্রাকৃতিক রঙের রাঙানো সুতা দিয়ে কাপড় বুনতে। এ ক্ষেত্রেও আমি সফল হয়েছি। যদিও প্রথম দিকে সেটা সহজ ছিল না। আমি সুতা রঙ করিয়ে দিয়েছি। এরই মধ্যে জামদানি বেহাত হওয়ার উপলক্ষ তৈরি হয়। ভারত জামদানিকে তাদের বলে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের জন্য আবেদন করে। তখন আমরাই সেটা ঠেকানোর উদ্যোগ নিয়ে সফল হই। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করে ভারতের আবেদন স্থগিত করা হয়। পরে বাংলদেশের পক্ষে আবেদন করে সরকার। এবং আমরা সেটা পাই। এ ছাড়া ইউনেসকোর স্বীকৃতিও মিলেছে। এই বয়ন হেরিটেজ আসলে বাংলাদেশের।
তবে একটা ভালো কাজ, বড় কাজ আমার করার খুবই ইচ্ছা ছিল। বিশেষত জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সদস্য হিসেবেই আমি এই স্বপ্ন দেখেছি। এর পেছনে একটা কারণ অবশ্যই ছিল। কারণ, জামদানি বয়নশিল্পীরা সমস্যায় আছে। পরিস্থিতি আর উপকরণের সমস্যায় নি¤œমানের কাপড় বুনছে। আবার দামও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। পাশাপাশি আমাদের তরুণ প্রজন্মের বয়নশিল্পীরাও যে পারে, সেটা আরও একবার প্রমাণ করে দেখানো। আমি বলতে পারি, এ ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি সফল হয়েছি। কারণ, এবার যেসব শাড়ি বোনা হয়েছে, তার কোনোটারই ডিজাইন ৫০ বছরের পুরানো নয়। আর বয়নশিল্পীদের বড়জোর এক বা দুজনের বয়স ৫০ কিংবা তার বেশি। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের তরুণ বয়নশিল্পীরা অসাধ্য সাধন করতে পারে।
এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই, আমার পরিকল্পনা ২০১৭ সালে কারুশিল্প পরিষদকে অবহিত করি। সবাই সানন্দে রাজিও হয়। কিন্তু যে পরিসরে আমি এবং আমরা ভেবেছিলাম, সেই পরিসরে উৎসবের আয়োজন ব্যয়বহুল। তবে আমরা পিছপা হইনি। সবার আগে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে বিষয়টি জানাই। আমরা প্রজেক্ট প্রোফাইল তাদের দিই। এবং তারা সানন্দে রাজি হয়। ইতিমধ্যে আমি আমার বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরোনো শাড়ি এবং পুরোনো শাড়ির ছবি জোগাড় করি। নিজেও বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। পাশাপাশি আমরা উদ্যোগ নিয়েছি ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটি হিসেবে সোনারগাঁয়ের স্বীকৃতি ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস কাউন্সিলের কাছ থেকে আদায় করার। সে নিয়ে কাজ হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আর দপ্তর থেকে আমরা অকুণ্ঠ সহযোগিতা পেয়েছি। আর নানা পর্ব পেরিয়ে এই উৎসব এখন বাস্তবতা পাচ্ছে। সত্যিই একটা বড় কাজ হচ্ছে। অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। আমার আসলেই খুব ভালো লাগছে। সবার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। আমরা কী পারি, আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা কীভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি, তা এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসী দেখতে পাবে। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কী হতে পারে।

লুভা নাহিদ চৌধুরী

উৎসব সমন্বয়ক ও মহাপরিচালক বেঙ্গল ফাউন্ডেশন

২০১৮ সালের শুরুর দিকে কারুশিল্প পরিষদের নির্বাহী সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় জামদানি উৎসব নিয়ে। তারা ১০০ বছরের পুরোনো জামদানির নকশা সংগ্রহ করে এখানকার তাঁতিদের দিয়ে কাজ করাতে চান। সাধারণভাবে এ ধরনের কাজ করতে গেলে তাদের কিছুটা সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। সহযোগিতা কেবল অর্থের ছিল না; কারণ, সেটা হয়তো অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যেত। কিন্তু পুরো কাজটি করার জন্য তারা বড় পরিসরে চিন্তা করেছেন; এর সঙ্গে সোনারগাঁকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটি করার প্রস্তাব সরকারকে দেওয়ার কথা। পুরো ব্যাপারটি বাস্তবায়ন করতে গেলে এবং পুরো জামদানি উৎসবকে বাস্তবায়ন করতে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ে যে সহযোগিতা দরকার; অর্থাৎ এটির পরিকল্পনা বলেন, বাজেট বলেন—সব। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বিষয়টি সার্বিক বিবেচনায় সানন্দে রাজি হয়। কারণ, আমরা তো জানি, এমন কিছু কিছু কাজ আছে, যেগুলোর জন্য সহজে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসে না। বাণিজ্য, বিপণন বা অন্যান্য কারণে। আমরা তো ওইটুকু পর্যন্ত যুক্ত আছি। বিপণনের যে জায়গাটি, আসলে অন্য। যেটা আমরা এক্সিকিউটিং পার্টনার বলছি। আড়ং, অরণ্য, কুমুদিনী, টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির—এই চারটি প্রতিষ্ঠান যারা এ কাজটি করে থাকে। ক্র্যাফটের সঙ্গে বিপণনের সম্পর্ক তো আছেই। ওই অংশটা অতএব তারাই দেখবেন।
এই উৎসবের মূল বিষয় জামদানি। আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেটা—অর্থাৎ, বয়নশিল্পীরা পণ্যগুলো বানাতে পারবেন কি না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কারুশিল্প পরিষদও অতিক্রম করেছে। এ সময়ের যারা বয়নশিল্পী, তাদের দিয়ে ১০০ বছর আগের শাড়িতে যে ধরনের কাজ হয়েছে, শুধু নকশাই নয়, যে মান তারা চাইছিলেন, সেটা নিশ্চিত করা তো প্রায় অসম্ভব কাজ। কারুশিল্প পরিষদ নিজেই করেছে কাজটা। কিন্তু ড্রয়িংগুলো রেডি করে দেওয়া, সেগুলোকে সাজানো, সেগুলোকে ঠিক করে দেওয়া, এর সঙ্গে সেমিনার আছে, প্রদর্শনী আছে, প্রকাশনা আছে, ফিল্ম আছে—অনেক কিছু যুক্ত। আমরা সেসব জায়গা দেখছি।
মোদ্দাকথা হচ্ছে, একটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে, অনেক মানুষ উৎসাহী হয়ে জামদানি পরা শুরু করবে এমন নয়। বড় কথা হচ্ছে, এ জ্ঞান ধরে রাখার উপায় কী, এ জ্ঞান কোন দিকে প্রবাহিত করা যায়, আর এটি কীভাবে হাই কোয়ালিটি ফাইন ফ্যাব্রিক হতে পারে। আমরা তো পৃথিবীতে একমাত্র নই যে হাই কোয়ালিটি ফাইন ফেব্রিক তৈরি করি। জামদানি আমাদের এখানে হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশেও তো নানা পণ্য আছে, যেগুলো খুব হাই কোয়ালিটি প্রডাক্ট, উচ্চমূল্যের পণ্য। সেগুলো বেঁচে আছে, কারণ তারা সেগুলোর পরিধি বড় করেছে বলে। জামদানি বানাব আমরা কিন্তু ব্যবহার করবে সারা বিশ্ব। বিশ্বে তো এ রকম একটা ধনী, রুচিমান এবং একটা ইন্ডাস্ট্রি আছে। সেখান পর্যন্ত আমাদের নিতে পারতে হবে।
এসব ভেবে কাজ শুরু করে বলতে গেলে সমে এসে পৌঁছতে যাচ্ছি। আশা করি এই আয়োজন সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।

চন্দ্র শেখর সাহা

ডিজাইনার, গবেষক ও প্রদর্শনীর কিউরেটর

জামদানি নিয়ে দেশে বিভিন্ন সময়ে হয়েছে বিভিন্ন আয়োজন। বাজারজুড়ে কলেবর বেড়েছে যুগে যুগে। একই সঙ্গে বয়নশিল্পে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। আধুনিকায়ন আর সহজলভ্যতার প্রয়াস হিসেবে পরিবর্তন চলেছে। কিন্তু ঐশ্বর্যের ঐতিহ্য এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ খানিকটা। তাঁতশিল্পের বর্তমান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে বয়নের পরম্পরা। দেশের উদ্যোক্তা, ডিজাইনার, ক্রেতা মোটিফের আর বুননের ভুল ব্যাকরণে অভ্যস্ত হয়েছে অনেকটাই। অথচ আমাদের জনপদের গর্বের জামদানির মোটিফের বৈচিত্র্য আর বুনন কৌশল উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের কাছেও এক অভূতপূর্ব রহস্য। জরুরি তাই পুনরুদ্ধার। এ ভাবনার পথ ধরে আসলে জামদানি উৎসবের আয়োজন। আর এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশই হচ্ছে ‘ঐতিহ্যের বিনির্মাণ’ শিরোনামে প্রদর্শনী।
‘কারুশিল্প পরিষদের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুবী গজনবী সবার আগে বিষয়টি নিয়ে ভাবেন। তিনি চেয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী জামদানিকে নতুন করে উপস্থাপনা। এই প্রজন্মের বয়নশিল্পীদের মুনশিয়ানার প্রদর্শন।
সেই চিন্তা থেকেই আলোচনা, পৃষ্ঠপোষক সংগ্রহ এবং কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তার বাস্তবায়ন শুরু।
জামদানির বয়নকৌশল ও মোটিফগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার বিষয়ে পরিকল্পনা হয়। প্রথমেই আসে সংগ্রহের বিষয়টি। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করার কাজ শুরু হয়। ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং অ্যান্টিক কালেকশন সংগ্রহের মাধ্যমে। দেশের তো বটেই, বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান আর জাদুঘর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে পুরোনো জামদানি কিংবা পুরোনো জামদানির ছবি। আয়োজনের অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নেয় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। এই উৎসবে বিদেশিদের অংশগ্রহণ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। শাড়ি বোনার দায়িত্ব নিয়ে এক্সিকিউটিং পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয় আড়ং, টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির, অরণ্য ও কুমুদিনী। এই চার ব্র্যান্ড বহু বছর ধরে যুক্ত আছে জামদানি বুনন, বিপণন ও সংরক্ষণে।
প্রাথমিক কার্যক্রমের পর সময় আসে গবেষণার। বিশদ গবেষণার মাধ্যমেই পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করা হয়। চার এক্সিকিউটিং পার্টনার ছাড়াও ছবি থেকে নকশা পুনর্নির্মাণে কাজ শুরু করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ। চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, ‘১৫০ থেকে ২০০ ছবি সংগ্রহের শেষে আমরা জামদানি বয়স, নকশা, বুনন কৌশল নিয়ে গবেষণা শুরু করি। ছবি থেকে আমরা গ্রাফিক্যাল ডিজাইন উদ্ধার করেছি। এরপরে বয়নশিল্পীরা নকশাকে কৌশলগত গণিতে পরিণত করেছেন। নতুন করে জামদানি তৈরি বেশ খানিকটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আমাদের দেশের ধারাবাহিক ডকুমেন্টেশনের অভাব রয়েছে। নানা রকম প্রতিকূলতার কারণে বয়নশিল্পীরা উপকরণ ও জামদানিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। এ পরিবর্তনের পরিমাণ বিশাল। যার প্রমাণ পাওয়া যাবে প্রদর্শনীতে। পৃথিবীজুড়ে বয়নশিল্পের কদর রয়েছে। অথচ সে সময়ের জামদানির নিজস্বতা হারিয়েছে কতটা তার বাস্তব প্রমাণ মিলবে প্রদর্শনীতে। জামদানি বয়ন হয় গাণিতিক নিয়মে। যার কোনো লিখিত ধারণা নেই। পুরোটাই স্মৃতি আর শ্রুতিনির্ভর। একটি মোটিফ তোলার জন্য এক শ থেকে পাঁচ শ সুতার লাইন প্রয়োজন হয়। কখনো কখনো এর পরিমাণ বেশিও হয়ে থাকে। আমি উদাহরণ হিসেবে কল্কার কথা বলতে পারি। আট, দশ, বারো ইঞ্চির এ মোটিফ দুই দিকে মুখ করে বোনা হয়। ডান পাশের মোটিফের সঙ্গে পুরোপুরি বিপরীতমুখী নকশা তৈরি করতে হয় বাম দিকে।’
জামদানির মোটিফ আর বুনন কৌশলেই এর নিজস্বতা। ইংরেজিতে তাই জামদানিকে ব্রিটিশরা নাম করেছিল ফিগার মোটিফ।
সময়ের স্রোতেই বুনন উৎপাদনের পরিবর্তন এসেছে। আমরা ফিরেছি সেই শিকড়ে। বয়নশিল্পীরা ধৈর্য, সাহস, স্মৃতিশক্তি, অসাধারণ অনুধাবন দক্ষতার সঙ্গে শাণিত নিপুণতায় বুনেছেন অসাধারণ সব কাপড়। ব্যবহৃত হয়েছে অম্বর খাদি সুতা। এক শ থেকে দুই শ কাউন্টের সুতার ব্যবহার করা হয়েছে। টানাতে এ সুতার ব্যবহারে তারা অভ্যস্ত নন দীর্ঘদিন। এবার তারা টানায় কাজ করেছেন। সানা বদল করেছেন, রিট বদল করেছেন। প্রমাণ করেছেন অসম্ভব বলে কিছু নেই। আমরা অনুধাবন করেছি সম্ভব, অসম্ভব পুরোটাই কল্পনামাত্র।
তিনি আরও বলেন, ‘দুই শ বছরের ঐতিহ্যের গল্পকে সত্য প্রমাণিত করেছে এবারের সব গৌরবময় অতীতের স্মৃতি, সময়ের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বিলীয়মান ঐশ্বর্যের পুনর্জাগরণের অন্য নাম এই জামদানি উৎসব।
লেখা: সারাহ্ দীনা

মুনিরা এমদাদ

স্বত্বাধিকারী, টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির

১৯৮২ সালে বাংলাদেশের তাঁত নিয়ে টাঙ্গাইল শাড়ী কুটিরের সূচনা। দেশের বয়নশিল্পের ঐতিহ্য আর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হাউজটি শুরু থেকেই প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। টাঙ্গাইল বয়নশিল্পের পুনর্জাগরণকে মাথায় রেখেই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ। যদিও পথচলার পরপরই অন্যান্য বয়নশিল্পসামগ্রীর বিপণন ও প্রসারে ভূমিকা রাখা শুরু করে টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, জামদানি বয়নশিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় উদ্যোগী হয় টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উপাদান জামদানি। আমি বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও সরকারি সহায়তায় জামদানি ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জনের পর জামদানি এখন শুধু বয়নশিল্প নয়, দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এটা মাথায় রেখেই টাঙ্গাইল শাড়ী কুটির জামদানি শাড়ি তৈরি এবং বিপণনে ভূমিকা রাখছে। ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জনের পর থেকেই বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের একটি জামদানি উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। আর এই ভাবনাটা ছিল আমাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুবি গজনবীর।
জামদানির পুঁজি হচ্ছে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিল্পীর মেধা, মৌলিকতা, ধৈর্য ও শ্রম। দিনে দিনে জামদানি বয়নশিল্পীদের বংশধরেরা তুলনামূলকভাবে কম শ্রমে অধিক উপার্জনের পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে। মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের কারণে আঁকড়ে ধরে থাকলেও যারা নতুন কাজ করছে, তারা আপোসে অনাগ্রহী। এই উৎসবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জামদানির বাজার প্রসার, কাজের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তাদের পেশার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। আমাদের ঐতিহ্যকে আমাদেরই লালন করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জামদানির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। ভালো দামে জামদানি কিনে বাঁচিয়ে রাখতে হবে জামদানি আর জামদানি বয়নশিল্পীদের।
তাই এই উৎসবের আয়োজক জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের বর্তমান কোষাধ্যক্ষ হওয়া সত্ত্বেও আমি সাগ্রহে একজিকিউটিং পার্টনার হতে রাজি হয়েছি। কারণ, আমি মনে করি, এটা আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্মানজনক। আমরা অনেক নতুন ডিজাইনের শাড়ি এই উপলক্ষে বুনিয়েছি। আমাদের বয়নশিল্পীরা তাদের দক্ষতায় অসাধারণ সব শাড়ি বুনেছে। এ জন্য একজন উদ্যোক্তা, কারুশিল্প সুহৃদ এবং কারুশিল্প পরিষদের সদস্য হিসেবে আমি যারপরনাই গর্বিত। আমাদের বয়নশিল্পের অগ্রযাত্রার এই উৎসব দেখবে সারা বিশ্ব। এ জন্য কারুশিল্প পরিষদের সব সদস্য এবং আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানাই।

শ্রীমতী সাহা

পরিচালক, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) লি.

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁ এলাকার বয়নশিল্পীরা বংশপরম্পরায় এবং ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি শাড়ি তৈরি করে আসছে। এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দরকার পুণর্জাগরণ আর পৃষ্ঠপোষকতা। আর অবশ্যই নমুনা তৈরির ক্ষেত্রে গুণগত মান, রঙ, নকশা ও মাপজোখের তত্ত্বাবধান জরুরি।
তাই বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ উদ্যোগ নিয়েছে জামদানি উৎসব আয়োজনের। এই মহতী উদ্যোগে অংশ হতে পেরে কুমুদিনী বিশেষভাবে গর্বিত। কারণ, আমরা জামদানি নিয়ে কাজ করছি দীর্ঘদিন ধরে। ফলে জামদানির এমন উদ্যোগের সঙ্গে যে আমরা থাকব, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এবারের অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। কারণ, কারুশিল্প পরিষদ অনন্য সাধারণ সব জামদানির ডিজাইন সংগ্রহ করে চার একজিকিউটিং পার্টনারদের দিয়েছে। আমরা পেয়েছি এসব অসাধারণ কাজ। আমাদের অতীতের বয়নশিল্পীদের এসব শিল্পকর্ম দেখে অবাক হতে হয়। তবে গর্বের বিষয় এমন কঠিন ডিজাইন এখনকার তরুণ প্রজন্ম দারুণভাবে বিনির্মাণ করেছে। ২০০ কাউন্টের খাদি সুতা দিয়ে নতুনভাবে এসব জামদানি শাড়ি বোনা হয়েছে। শুরুতে খাদি সুতা নিয়ে বয়নশিল্পীরা খুবই দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু প্রাথমিক আড়ষ্টতা কাটিয়ে তারা তাদের দক্ষতার প্রমাণ রেখেছে।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের বিকাশে আমরা সরকারের সুনজর কামনা করছি। আমরা আরও আশা করছি, এই শিল্পের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে অবশ্যই তারা এগিয়ে আসবে এবং এই খাতে অর্থায়নের জন্য একই সঙ্গে শিল্পপতিদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছি। ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিলুপ্তপ্রায় ঢাকাই জামদানিকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদেরকে আরও সচেষ্ট হতে হবে। আর্থিক প্রণোদনা আর সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা হলে বয়নশিল্পীরা আরও উৎসাহিত হবে। এই উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের বয়নশিল্পীদের দক্ষতা আবারও সবার সামনে তুলে ধরা সম্ভব। কোনো সন্দেহ নেই এ এক মহৎ পদক্ষেপ।
ট্রাস্ট হিসেবে আমরা সারা দেশে বিশেষ করে কারুশিল্পী ও দুস্থ মহিলাদের হস্তশিল্পের বিনিময়ে সহযোগিতা করে আসছি। তবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানিকে টিকিয়ে রাখার জন্যও আমরা দায়বদ্ধ।

ছবি: কুমুদিনী

তামারা আবেদ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেস

বাংলাদেশে তাঁতশিল্পে জামদানি বয়নশিল্প কিংবদন্তির অন্যতম অংশ। দেশজ ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও ধারাবাহিকতা বহমান রাখতে ১৯৭৮ থেকে আড়ং কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে জামদানিকে সামগ্রিকভাবে সর্বসাধারণের কাছে নান্দনিকভাবে উপস্থাপনের জন্য ১৯৮১ সালে শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজন করা হয় প্রথম জামদানি প্রদর্শনী। সেই সময়ে আড়ং আদি জামদানির প্রচুর হারিয়ে যাওয়া মোটিফ প্রচলিত নকশায় ফিরিয়ে এনে নতুনভাবে উপস্থাপন করে।
২০১০ সালে জামদানিকে আরও উচ্চতর বয়ননৈপুণ্যে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আড়ং ‘স্টোরি অব প্রাইড’ শিরোনামে শিল্পকলা একাডেমিতে আরেকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এর মাধ্যমে জামদানির গৌরব, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের সমাহার ঘটে সেই সময়ে তৈরি অসাধারণ সব সম্ভারে; অনন্য এই সংগ্রহ নগরবাসীর কাছে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিল আড়ং। এই প্রদর্শনীতে আড়ং প্রথম ১০০ কাউন্টের সুতা দিয়ে সফট কোয়ালিটি জামদানি নিয়ে আসে এবং এর নান্দনিক নকশা, গুণগত মান ক্রেতাদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে। এই প্রদর্শনীর পর জামদানি শাড়ির জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। বিশেষত তরুণীদের মধ্যে এই আগ্রহ যথেষ্ট পরিলক্ষিত হয়। এর পর থেকে অসংখ্য তরুণী নিজেদের গায়েহলুদ আর বিয়েতে জামদানি পরতে উৎসাহিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জামদানি তাঁতের নতুনভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বোনা জামদানি উৎপাদনে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
এরপর ২০১৬ সালে দৃক আয়োজিত মসলিন উৎসবে আড়ং আবারও জামদানির উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা রাখে।
আড়ং তার বিপণনকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জামদানির বৈচিত্র্যময় সম্ভার উপহার দিয়ে চলেছে। ফলে পৃষ্ঠপোষক ও দক্ষ জামদানি বয়নশিল্পীদের বিশ্বাস ও আস্থা গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
আড়ংয়ের নিজস্ব ডিজাইন স্টুডিওতে দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ডিজাইনারদের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা জামদানি বয়নশিল্পের চর্চা ও বিকাশের ধারাকে প্রতিনিয়ত ক্রেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।
ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় আড়ং আজ দেশ ও বিদেশে এক সুনাম অর্জন করতে পেরেছে। সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত ও ব্র্যাকের প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ ও সহযোগিতা এই বিষয়ে পরোক্ষভাবে কাজ করছে। জামদানির মোটিফ ক্যাটালগ দুষ্প্রাপ্য; তবে জামদানি বয়ন নিয়ে লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ আড়ং ডিজাইন স্টুডিওর আর্কাইভে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত রয়েছে।
জামদানি বয়নশিল্পের উন্নয়নে বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের উদ্যোগে এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষণায় আয়োজিত হচ্ছে ‘জামদানী উৎসব’। এর একটি গুরুত্বপর্ণ অংশ ‘ঐতিহ্যের বিনির্মাণ’ শীর্ষক প্রদর্শনী। এই উৎসবে আড়ং অন্যতম এক্সিকিউটিং পার্টনার হিসেবে পুরোনো কিছু শাড়ি নতুন করে বিনির্মাণ করেছে, যা সর্বোৎকৃষ্ট মানের ২০০ কাউন্ট খাদি সুতায় তৈরি। এসব জামদানি শাড়ি তৈরিতে শত বছরের পুরোনো ও দুর্লভ কিছু শাড়ির ডিজাইন ও মোটিফ ব্যবহৃত হয়েছে। এসব শাড়ি জামদানি উৎসবের প্রদর্শনীতে স্থান পাবে। জামদানির এই পুনরাবিষ্কার নতুন সম্ভাবনায় এই বয়নশিল্পের অগ্রগতির পথকে সুগম করবে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ের এই উৎপাদন প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে আমাদের কারুশিল্পীরা অর্জন করেছে সর্বোচ্চ মাত্রার কর্মদক্ষতা। আমরা বিশ্বাস করি, জামদানি বয়নশিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ ও ক্রমবর্ধমান বাজার মানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের এ দক্ষতা, আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস দারুণভাবে সাহায্য করবে।
এই জামদানি উৎসবের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্ম জামদানি বয়নশিল্পের ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে এবং এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে।
দেশজ বয়নশিল্পের গৌরবের কিংবদন্তির বর্তমানের বাস্তবতায় রচিত জামদানি উৎসব সবদিক থেকে এই শিল্পের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকাটি যে কতটা প্রয়োজনীয়, সেই বোধে আস্থাশীল হবেন। আমার বিশ্বাস, বয়নশিল্পীদের সামাজিকভাবে দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে সবাই মিলে অবদান রাখতে পারলে দেশের ঐতিহ্য রক্ষায় ও গৌরবের বিনির্মাণে সামাজিক দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে।

নওশীন খায়ের

ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরণ্য ক্রাফটস লি.

জামদানি তো মসলিন থেকেই এসেছে। নানা কারণে আমাদের প্র্যাকটিসটা হারিয়ে গেছে। এখনকার বয়নশিল্পীরা আছে, তারা খুব ফাইন কাউন্টের সুতায় জামদানি বুনতে পারে না। আমার ধারণা, বেশির ভাগই ৮২ কাউন্টের সুতা নিয়ে কাজ করে।
ন্যাশনাল ক্র্যাফটস কাউন্সিলে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এই প্রজেক্টের জন্য। প্রথম মিটিংয়ে তামারা আবেদ, মুনিরা এমদাদ, কুমুদিনীর প্রতিনিধিরা এবং আমি উপস্থিত ছিলাম। ক্র্যাফটস কাউন্সিল পুরোনো জামদানির ছবি আমাদেরকে লটারির মাধ্যমে ভাগ করে দেয়। যাতে কারও কোনো সন্দেহ না থাকে। আসলে আইডিয়া ছিল বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত অনেক বছরের পুরোনো জামদানিকে বিনির্মাণ করা। আমরা সে চেষ্টাই করেছি।
অরণ্য ন্যাচারাল ডাই নিয়ে কাজ করে; কিন্তু আমাদের ভাগ্যে সাদা-কালো জামদানি পড়ল। আগেকার সময়ে আমার মনে হয় কালার স্কিম কমই থাকত। আমি তাই জানাই, অরণ্য তো কেমিক্যাল ডাইয়ের কাজ করবে না। এটা আমাদের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হবে। তখন বলা হয়, কেমিক্যাল ডাই করলে সমস্যা নেই। কিন্তু তাহলে তো অন্যদের মতোই হয়ে যাবে। আমাদের স্বাতন্ত্র্য থাকবে না।
আমি এ নিয়ে রিসার্চ শুরু করি ন্যাচারাল ডাইয়ে কালো রঙ আনার। থাইল্যান্ডে গিয়ে জানতে পারি, একধরনের উপাদান আছে। যেটাতে নাকি কালো রঙ হয়। সেটি এনে ট্রাই করি, কিন্তু হয় না। এ রকম অনেক এক্সপেরিমেন্ট করে করে শেষমেশ আমি দুটি রঙ মিলিয়ে যেকোনোভাবে হোক কালো রঙ পেয়েছি। ন্যাচারাল ডাইয়ে কালো কিন্তু বিশ্বব্যাপী সবাই করে না। কিন্তু অরণ্য করছে। এটা অবশ্যই আমাদের সাফল্য। ডিজাইন পেয়ে আমাদের বয়নশিল্পী আর প্রডিউসারদের বেছে নিই। এরপর তাদের স্যাম্পল তৈরি করতে দিই।
মিহি সুতার সোর্স করা খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, আমাদের দেশে তো ভালো সুতা পাওয়া যায় না। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আমাদের দেশে ১০০ কাউন্টের রিলের সুতা পাওয়া যায়। ওটার সঙ্গে আমরা খাদি সুতা ব্যবহার করব। আমরা ভারত থেকে সুতা অল্প অল্প এনে আমাদের স্যাম্পল তৈরি শুরু করি।
এই শাড়ির নকশা বুননে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কল্কা। বাংলাদেশের জামদানিতে কল্কা বোনার চল বলতে গেলে হারিয়ে গেছে। অনেক আগে এটা দেখা যেত। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কল্কাকে আবার ফিরিয়ে আনা। চারটি হাউসেরই লক্ষ্য ছিল অভিন্ন।
বয়নশিল্পীদের ম্যানেজ করাও চ্যালেঞ্জিং ছিল। মজুরি থেকে শুরু করে সবকিছুই প্রায় দ্বিগুণ দিতে হয়েছে। অনেক সময় লেগেছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে।
এভাবে আমরা কাজ শুরু করি। অরণ্য থেকে আমরা পুরো প্রজেক্টের একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছি।
সত্যি বলতে কি, কেমিক্যাল ডাই ছিল না। ১৮ শতকের পর কেমিক্যাল ডাই এসেছে। আগে জামদানির ন্যাচারাল কন্টেক্স ন্যাচারাল ডাই দিয়েই শুরু হতো। সেই ধারা বজায় রেখে অরণ্য সব সময়ে প্রাকৃতিক রঙেই জামদানি বুনে থাকে। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, উৎসবের সব কাপড়ই অরণ্য লেগাসি বজায় রেখে ন্যাচারাল ডাই দিয়েই করা হয়েছে। বাকিরা সবাই কেমিক্যাল ডাই করলেও অরণ্য করেনি। এই জায়গায় আমরা ডিফরেন্ট। আর সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে অরণ্য যথেষ্ট গর্বিত।

This Post Has 3 Comments
  1. আসলেই অনেক ভালো একটি উদ্যোগ। আমার মত যারা জামদানি শাড়িকে সারা বিশ্বে এবং নিজের দেশে আবারো জনপ্রিয় করতে চাই তাদের জন্য এই রকম আয়োজন সত্যি প্রশংসার দাবিদার। জামদানি আমাদের ঐতিহ্য, অহংকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top