skip to Main Content

ফিচার I ভেজালচ্যুতি

‘ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়/ ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়’—কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখে গেছেন প্রায় এক শতক আগে। এত দিনে অবস্থার খুব বেশি উন্নত হলো কি? সেই তর্কে না গিয়ে, খাদ্যদ্রব্য কেনার আগে পরখ করে নেওয়ার দিকে মন দেওয়া যাক

মধু: এক গ্লাস পানিতে এক চামচ মধু নিয়ে ধীরে ধীরে নাড়ার পর যদি দেখা যায় পানির সঙ্গে মিশে গেছে, তার মানে তাতে ভেজাল আছে! খাঁটি মধু পানির সঙ্গে পুরোপুরি মেশে না, বরং ছোট পিন্ডের আকারে গ্লাসের তলায় জমে থাকে। মধুতে সামান্য পানি ও ভিনেগার মেশালে যদি ফেনা ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে সেই মধু নকল। ভালো মধুতে ফেনা উঠবে না। তা ছাড়া নকল মধুতে সহজে আগুন ধরে না। কিন্তু আসল মধুতে দ্রুত আগুন ধরে। মধুতে ভেজানো তুলায় আগুন দিয়ে এই পরীক্ষা করা যেতে পারে।
দুধ: দুধে ভেজাল বলতে অনেকে পানি মেশানোকেই বোঝেন। কিন্তু পানি ছাড়াও এতে ডিটারজেন্ট মেশানো হতে পারে। খুব সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে তা ধরা সম্ভব। ঢালু কোনো মসৃণ পাত্রে এক ফোঁটা দুধ ফেলার পর তা যদি ধীরগতিতে গড়িয়ে পড়ে এবং গড়ানোর পথে সাদা দাগ রেখে যায়, তাহলে সেটি খাঁটি দুধ। যদি দ্রুত গড়িয়ে পড়ে এবং দাগ না রেখে যায়, তাহলে ভেজাল। ডিটারজেন্ট আছে কি না বুঝতে সমপরিমাণ দুধ ও পানি নিয়ে ঝাঁকাতে হবে। ঘন ফেনা উঠলে বুঝতে হবে ভেজাল আছে; পাতলা হলে দুধ ভালো।
জিরা: ভেজাল হিসেবে এই মসলায় মেশানো হয় মৌরি। এ ক্ষেত্রে চিবিয়ে তা পরখ করা যেতে পারে। ভালো জিরার স্বাদ ঝাঁজালো। গন্ধ তীব্র। তা ছাড়া কিছু জিরা হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে জিরা ও মৌরির পার্থক্য চোখে পড়বে। কিছু ক্ষেত্রে জিরার সঙ্গে কয়লাসহ ঘাসের বীজ মেশানো হয়। এ ধরনের ভেজাল নির্ণয় করতে হাতের তালুতে জিরা নিয়ে পিষতে হবে। যদি তালুতে কালো কালি লাগে, তাহলে বুঝতে হবে তাতে ভেজাল রয়েছে।
ধনে: এর গুঁড়ায় ভেজাল হিসেবে মেশানো হয় কাঠের গুঁড়া। ভেজাল ধরতে এক গ্লাস পানিতে এক চা-চামচ ধনেগুঁড়া গুলিয়ে নিতে হবে। গুঁড়া খাঁটি হলে পানি পরিষ্কারই থাকবে। ভেজালযুক্ত হলে কাঠের গুঁড়া পানির ওপর ভেসে উঠবে।
দারুচিনি: এতে ভেজাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় ক্যাসিয়ার বার্ক। তা শনাক্ত করতে একটি কাচের প্লেটে দারুচিনি নিয়ে ভালো করে দেখতে হবে। ক্যাসিয়ার বার্ক দারুচিনির তুলনায় শক্ত। এটি সুগন্ধ না-ও দিতে পারে। অন্যদিকে, দারুচিনির ছাল পাতলা। তা ছাড়া দারুচিনি কেনার সময় একটি টুকরা ভেঙে দেখা যেতে পারে। যদি হাতে রং লাগে, তাহলে বুঝতে হবে ভেজাল!
মরিচের গুঁড়া: ভেজাল হিসেবে এই পণ্যে মেশানো হয় ইটের গুঁড়া। তা ছাড়া ট্যালকম পাউডার, সাবানের গুঁড়া, রং, এমনকি বালিও মেশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এই ভেজাল ধরতে এক গ্লাস পানিতে কিছুটা মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে নিতে হবে। পানির ওপরে যে আস্তরণ পড়বে, তা আলতো করে তুলে হাতের তালুতে নিয়ে ঘষতে হয়। যদি দানা দানা লাগে, তাহলে বুঝতে হবে তাতে ইটের গুঁড়া কিংবা বালি রয়েছে। পানিতে ফেনা উঠলে বুঝতে হবে মেশানো হয়েছে সাবানের গুঁড়া কিংবা পাউডার।
গোলমরিচ: এতে মেশানো হয় পেঁপের বীজ। এক গ্লাস পানিতে গোলমরিচের গুঁড়া ডুবিয়ে ভেজাল ধরা যেতে পারে। ভালো গুঁড়া ডুবে যায়। কিন্তু পেঁপের বীজ মেশানো থাকলে তা পানির ওপরে ভেসে উঠবে। তা ছাড়া গোলমরিচ কেনার সময় সেটির ঘ্রাণ শুঁকে দেখা যেতে পারে। তাতে কেরোসিনের গন্ধ পেলে কিংবা গুঁড়া বেশি চকচকে দেখালে বুঝতে হবে ভেজাল আছে!
সরিষা বীজ: এর সঙ্গে মেশানো হয় অরগেমন বীজ। তা নির্ণয় করতে হাতের তালুতে কিছু দানা নিয়ে পরখ করা যেতে পারে। সরিষা বীজের পৃষ্ঠ মসৃণ। অপরদিকে অরগেমনের পৃষ্ঠ কিছুটা রুক্ষ। তা ছাড়া সরিষার বীজ গুঁড়া করলে রং হয় হলুদ। বিপরীত দিকে অরগেমনের হয় সাদা।
হলুদ: একে হলদেটে করতে ভেজাল হিসেবে মেশানো হয় ক্রোমেট। খালি চোখে এই ভেজাল বোঝার উপায় নেই। তবে এক গ্লাস পানির সাহায্যে তা পরখ করা সম্ভব। পানিতে গোলানোর পর হলুদের রং ফিকে হয়ে গেলে এবং নিচে তলানি জমলে সেই হলুদকে খাঁটি ধরা যায়। যদি তা না হয়, তাহলে ভেজাল রয়েছে। কাঁচা হলুদের ক্ষেত্রে একটি কাগজের ওপর একখন্ড হলুদ রেখে তার ওপর ঠান্ডা পানি ঢেলে দিতে হবে। যদি রং ছড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে ভেজাল আছে।
ঘি: এটি পরীক্ষা করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, আসল ঘি চামচে নিয়ে গরম করলে দ্রুত গলে গিয়ে বাদামি বর্ণ ধারণ করে। তা ছাড়া ভালো ঘি মানুষের ত্বকের সংস্পর্শে এলে গলে যায়।
মাখন: এতে ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকে ডালডা। এক চামচ মাখন আগুনের ওপর ধরলে যদি দ্রুত গলে গিয়ে বাদামি রং ধারণ করে, তাহলে সেটি খাঁটি। যদি হালকা হলুদ বর্ণের হয়, তাহলে বুঝতে হবে মাখনে ভেজাল রয়েছে। ঘিয়ের মতো মাখনও ত্বকের সংস্পর্শে খুব দ্রুত গলতে শুরু করে।
চিনি: এই পণ্যে ভেজাল দ্রব্য হিসেবে মিশ্রিত হয় ইউরিয়া। তা নির্ণয়ের পদ্ধতি হচ্ছে পানিতে চিনি গুলিয়ে গন্ধ শোঁকা। ইউরিয়া মিশ্রিত থাকলে তাতে অ্যামোনিয়ার গন্ধ পাওয়া যাবে। যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে চিনিগুলো ভালো।
চা: কালো চায়ে ভেজাল হিসেবে মেশানো হয় কালো সিসা। তা নির্ণয়ে একটি ফিল্টার পেপারে অল্প চায়ের পাতা নিয়ে তাতে পানির ছিটা দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। এরপর কাগজটিকে ভালোভাবে ধুয়ে বাল্বের সামনে নিয়ে দেখতে হবে। যদি কালো বা খয়েরি দাগ দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে চায়ে ভেজাল রয়েছে। না থাকলে চা ভালো।
কফি: এক গ্লাস পানিতে কফির গুঁড়া দিয়ে গ্লাসটিকে ১০ মিনিট রেখে দেওয়া যেতে পারে। যদি তলানি জমে, তাহলে সেটিতে ভেজাল নেই। যদি পানির ওপর গুঁড়া ভাসতে থাকে, তাহলে তাতে ভেজাল থাকার ঝুঁকি রয়েছে।

 ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top